বিটিসি নিউজ ডেস্ক: আজ পবিত্র হজের মহান দিন। সৌদি আরবে আজ ৯ জিলহজ—ইয়াওমুল আরাফাহ। লাখো হাজি এখন মক্কা, মিনা ও আরাফাতের ময়দানে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত করে তুলছেন। আজকের দিনটি হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন; এই দিনের মূল আমল হলো উকুফে আরাফাহ বা আরাফার ময়দানে অবস্থান করা।
হাজিরা আজ মক্কায় যেসব আমল করবেন:
১. উকুফে আরাফাহ: হজের প্রধান রোকন।
আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা। মহানবী বলেছেন, ‘হজ হলো আরাফা। ’(তিরমিজি, হাদিস নম্বর : ৮৮৯)
অর্থাৎ আরাফার ময়দানে অবস্থান ব্যতীত হজ পূর্ণ হয় না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখন তোমরা আরাফাত থেকে ফিরে আসবে, তখন মাশআরুল হারামের কাছে আল্লাহকে স্মরণ করো।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৯৮)
আজ হাজিরা জোহর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফায় অবস্থান করে কান্নাকাটি, তাওবা ও দোয়ায় মশগুল থাকবেন।
২. বেশি বেশি তাওবা ও ইস্তিগফার করা : আরাফার দিন গুনাহ মাফের দিন।
এদিন আল্লাহ অসংখ্য বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আরাফার দিনের চেয়ে বেশি এমন কোনো দিন নেই, যেদিন আল্লাহ অধিকসংখ্যক বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৩৪৮)
৩. দোয়া ও মুনাজাতে মশগুল থাকা : আজকের দিনের সর্বশ্রেষ্ঠ আমল হলো দোয়া করা। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘সর্বোত্তম দোয়া হলো আরাফার দিনের দোয়া।’ (তিরমিজি, হাদিস নম্বর : ৩৫৮৫)
বিশেষ করে এই দোয়াটি বেশি বেশি পড়া সুন্নত: মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি দিনে এক শবার বলে,
لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، يُحْيِي وَيُمِيتُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
তাহলে তার জন্য দশটি গোলাম মুক্ত করার সমপরিমাণ সওয়াব লেখা হবে।
তার জন্য এক শত নেকি লেখা হবে, তার এক শত গুনাহ মুছে ফেলা হবে এবং সেদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত এটি তার জন্য শয়তান থেকে সুরক্ষা হবে। আর কেউ তার চেয়ে উত্তম আমল নিয়ে আসতে পারবে না, তবে সেই ব্যক্তি ছাড়া যে এর চেয়ে বেশি আমল করবে।’
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ইউহয়ি ওয়া ইউমিতু, ওয়া হুয়া ‘আলা কুল্লি শাইইন ক্বাদির।
অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব ও প্রশংসা তাঁরই। তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান। (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর : ৩২৯৩)
৪. তালবিয়া পাঠ করা: হাজিদের কণ্ঠে আজ বারবার উচ্চারিত হবে। সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
মহানবী (সা.) বলেন, ‘জিবরাঈল (আ.) আমার কাছে এসে আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে আমি যেন আমার সাহাবিদের তালবিয়ার সময় উচ্চৈঃস্বরে আওয়াজ করতে বলি।’
তালবিয়ার সেই মহান বাক্য হলো: لَبَّيْكَ اللّٰهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি উপস্থিত। আপনার কোনো শরিক নেই। নিশ্চয় সব প্রশংসা, নিয়ামত ও রাজত্ব আপনারই।’ (আবু দাউদ, হাদিস নম্বর : ১৮১৪) এই তালবিয়া হজের প্রাণস্বরূপ।
৫. কোরআন তিলাওয়াত করা ও জিকির করা:
আজকের দিনটি আল্লাহর স্মরণে কাটানো সবচেয়ে উত্তম। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নির্ধারিত দিনগুলোতে আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২০৩)
তাই হাজিরা আজ তাসবিহ, তাহলিল, তাকবির ও কোরআন তিলাওয়াতে ব্যস্ত থাকবেন।
৬. বিনয় ও কান্নার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা:
হজ শুধু কিছু আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি আত্মশুদ্ধির মহাসফর। আরাফার ময়দানে দাঁড়িয়ে একজন হাজি যেন কিয়ামতের ময়দানের কথা স্মরণ করেন। সাদা ইহরামে লাখো মানুষের এই সমাবেশ মানুষকে মৃত্যু ও আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর যেখান থেকে মানুষ ফিরে আসে, তোমরাও সেখান থেকে ফিরে আসো এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৯৯)
আজকের দিনটি মুসলিম উম্মাহর জন্য এক মহামূল্যবান দিন। হাজিরা আজ আরাফার ময়দানে অশ্রুসিক্ত চোখে আল্লাহর দরবারে নিজেদের সমর্পণ করছেন। কেউ ক্ষমা চাইছেন, কেউ জান্নাত চাইছেন, কেউ উম্মাহর শান্তি কামনা করছেন। এ যেন দুনিয়ার বুকে আখিরাতের এক জীবন্ত দৃশ্য।
আল্লাহ তাআলা সব হাজির হজ কবুল করুন, তাদের গুনাহ মাফ করুন এবং আমাদেরও একদিন তাঁর পবিত্র ঘরের মেহমান হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন। #















