খুলনা ব্যুরো: পহেলা বৈশাখ বাঙালির সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও সময়ের সঙ্গে এর উদযাপনে এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। একসময় গ্রামবাংলায় নববর্ষ ছিল সাদাসিধে, অকৃত্রিম ও আড়ম্বরহীন; আর এখন শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত এটি পরিণত হয়েছে বহুমাত্রিক ও জাঁকজমকপূর্ণ এক উৎসবে।
প্রায় ৫০ বছর আগের গ্রামীণ নববর্ষ ছিল সামাজিক বন্ধন ও লোকজ সংস্কৃতিনির্ভর। গ্রামের বটতলা বা খোলা মাঠে বসত বৈশাখী মেলা। সেখানে মাটির পুতুল, কাঠের খেলনা, বাঁশের বাঁশি, কদমা-বাতাসা ও বিন্নি ধানের খই ছিল প্রধান আকর্ষণ। নাগরদোলা, কবিগান, জারি-সারি বা পালাগানের আসর জমিয়ে তুলত উৎসবের আবহ।
খাদ্যাভ্যাসেও ছিল সরলতা। পান্তা-ইলিশের কোনো প্রচলন না থাকলেও কৃষকরা আমানি হিসেবে আগের রাতে পানিতে ভেজানো চাল খেয়ে নববর্ষের সূচনা করতেন। অতিথি আপ্যায়নে থাকত মুড়ি, গুড়, চিঁড়া ও ঘরে তৈরি পিঠা।
হালখাতা ছিল ব্যবসায়ীদের অন্যতম প্রধান আয়োজন। লাল রঙের নতুন খাতা খুলে মিষ্টিমুখ করিয়ে পুরনো বকেয়া পরিশোধের রীতি প্রচলিত ছিল। পোশাকেও ছিল না কোনো নির্দিষ্ট থিম সামর্থ্য অনুযায়ী সাধারণ সুতির কাপড়ই ছিল ভরসা।
সামাজিক বন্ধন ছিল এ উৎসবের মূল শক্তি। বিবাহিত মেয়েদের নাইওর আসা, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণ গ্রামীণ নববর্ষকে করে তুলত এক সার্বজনীন উৎসব।
অন্যদিকে বর্তমান সময়ে নববর্ষ উদযাপন অনেক বেশি আধুনিক, বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন ইউনেস্কোর স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্য, যেখানে বাঘ, হাতি ও লোকজ মোটিফের বিশাল প্রতিকৃতি স্থান পায়। শহরের রাস্তাঘাট ও বাড়ির আঙিনায় রঙিন আলপনা আঁকার ধুম পড়ে।
খাবারেও এসেছে পরিবর্তন। এখন পহেলা বৈশাখ মানেই পান্তা-ইলিশ, নানা পদের ভর্তা এবং রেস্তোরাঁয় বৈশাখী থালির আয়োজন। পোশাকে লাল-সাদা রঙের আধিপত্য, বুটিক হাউসের বিশেষ সংগ্রহ এবং মাটির গয়নার ব্যবহার উৎসবকে দিয়েছে নতুন মাত্রা।
আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় যুক্ত হয়েছে, লাইভ কনসার্ট, টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদযাপনের প্রকাশ। পাশাপাশি কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতা ও অনলাইন কেনাকাটা উৎসবকে করেছে আরও বাণিজ্যিক।
এদিকে, শতবর্ষী হালখাতা ঐতিহ্যও প্রযুক্তির প্রভাবে কিছুটা ম্লান হয়ে পড়েছে। টালি খাতার জায়গা নিয়েছে কম্পিউটার ও ডিজিটাল লেনদেন। ফলে আগের মতো কার্ড ছাপানো বা বড় পরিসরের আয়োজন কমে গেছে। তবে খুলনায় এখনো এই ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা রয়েছে।
জানা গেছে, বাংলা ১৪৩৩ উপলক্ষে নগরীর প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ ছোট-বড় প্রতিষ্ঠানে হালখাতার আয়োজন করা হয়েছে।
খুলনা বড়বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সোহাগ দেওয়ান জানান, হালখাতা ব্যবসায়ীদের ঐতিহ্য। কেউ ছোট পরিসরে, আবার কেউ বড় করে আয়োজন করেন।
মেসার্স মুরাদ ট্রেডিংয়ের পরিচালক জিয়াউল হক মিলন বলেন, আগের মতো জৌলুস না থাকলেও ঐতিহ্য হিসেবে আমরা হালখাতা পালন করছি।
অন্যদিকে নিউ ঐশী জুয়েলার্সের মালিক বাসুদেব জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে ১৪ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত তিনদিনব্যাপী হালখাতা অনুষ্ঠিত হবে।
সব মিলিয়ে, পহেলা বৈশাখের উদযাপন পদ্ধতিতে পরিবর্তন এলেও গ্রামীণ সরলতা ও নগর আধুনিকতার এই সহাবস্থানই বাঙালির নববর্ষকে করে তুলেছে আরও বৈচিত্র্যময় ও প্রাণবন্ত। #















