বিটিসি আন্তর্জাতিক ডেস্ক: নিরাপত্তার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের একক নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করার অংশ হিসেবে এবার ফ্রান্সের ‘পরমাণু ছাতা’র নিচে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নরওয়ে।
বুধবার (২৭ মে) প্যারিসে এক বৈঠকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখো এবং নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গাহর স্টোরে যৌথভাবে এই ঐতিহাসিক আলোচনার কথা নিশ্চিত করেছেন।
রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা বলয় (ন্যাটো) এবং মার্কিন পরমাণু সুরক্ষার ওপর দৃঢ়ভাবে নির্ভরশীল থাকা নরওয়ের জন্য এই পদক্ষেপকে তাদের প্রতিরক্ষা কৌশলে এক বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্যারিসে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ম্যাখো ও স্টোরে এই পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। সেখানে তারা একটি বৃহত্তর প্রতিরক্ষা চুক্তিতেও স্বাক্ষর করেন।
এই চুক্তির আওতায় ফ্রান্সের নেতৃত্বাধীন পারমাণবিক অস্ত্র উদ্যোগে নরওয়ের যোগদানও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গাহর স্টোরে বলেন, নরওয়ের প্রাথমিক প্রতিরক্ষা ঢাল হিসেবে ন্যাটো জোট এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই বহাল থাকবে।
তবে জোটের সামগ্রিক সুরক্ষায় ফ্রান্সের পারমাণবিক সক্ষমতাকে তিনি ‘একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান’ হিসেবে বর্ণনা করেন। এই নতুন পরিকল্পনার আওতায় নরওয়ে ফ্রান্সের ‘ফরোয়ার্ড নিউক্লিয়ার ডিটারেন্স’ বা অগ্রবর্তী পরমাণু প্রতিরোধ প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে, যা ফরাসি পারমাণবিক প্রতিরক্ষা কৌশলে ইউরোপীয় অংশীদারদের আরো নিবিড়ভাবে যুক্ত করবে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখো এই চুক্তি প্রসঙ্গে বলেন, ‘এই চুক্তি আমাদের দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার একটি শক্তিশালী নীতি প্রতিষ্ঠা করল।’
তিনি আরো যোগ করেন, এই গভীরতর সহযোগিতা কৌশলগতভাবে ইউরোপের স্বনির্ভরতা বা ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ অর্জনের আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করবে।
রাশিয়ার সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা, মস্কোর ব্যাপক পারমাণবিক সামরিকায়ন এবং ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর মনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কারণে সৃষ্ট পুঞ্জীভূত সংশয়ের মাঝেই এই যৌথ উদ্যোগ এলো।
ন্যাটোর সদস্য কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে থাকা ৫৬ লাখ জনসংখ্যার দেশ নরওয়ের সঙ্গে আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার সরাসরি সীমান্ত রয়েছে।
চলতি বছরের মার্চ মাসেই ফ্রান্স ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র পারমাণবিক পরাশক্তি হিসেবে তাদের পরমাণু ছাতার সুরক্ষা অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোতে প্রসারিত করার প্রস্তাব দিয়েছিল—যার ব্যাবহারিক অর্থ হলো, কোনো অংশীদার দেশে হামলা হলে ফ্রান্স নিজের পারমাণবিক শক্তি দিয়ে তার জবাব দিতে পারবে।
এর আগে রাশিয়ার সীমান্ত ঘেঁষা পোল্যান্ড এবং লিথুয়ানিয়া ফ্রান্সের এই পারমাণবিক সুরক্ষায় যুক্ত হয়েছিল; এবার সেই তালিকায় সর্বশেষ দেশ হিসেবে নাম লেখাল নরওয়ে।
এ ছাড়া যুক্তরাজ্য, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম এবং গ্রিসও ফ্রান্সের এই উন্নত প্রতিরোধ ফোরামে যুক্ত রয়েছে।
তবে নরওয়ের সংবাদ সংস্থা ‘এনটিবি’-কে প্রধানমন্ত্রী স্টোরে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, নরওয়ের দীর্ঘদিনের পারমাণবিক নীতি অপরিবর্তিত থাকবে এবং শান্তিকালীন সময়ে নরওয়ের মাটিতে কোনো ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন বা মজুদ করা হবে না।
প্রধানমন্ত্রী স্টোরে উল্লেখ করেন, ‘এই ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা ইউরোপীয় এবং আটলান্টিক অঞ্চলের নিরাপত্তাকে আরো শক্তিশালী করবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প আসার অনেক আগে থেকেই এটি প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছিল যে ইউরোপকে এখন প্রতিরক্ষায় আরো বেশি ব্যয় করতে হবে এবং শুধু একক দেশ হিসেবে নয়, বরং সমন্বিতভাবে বুদ্ধিদীপ্ত বিনিয়োগ করতে হবে।’
উল্লেখ্য, ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টসের (এফএএস) তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক শক্তিধর দেশ, যাদের প্রত্যেকের কাছে ৫,০০০-এর বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে।
এর বাইরে চীনের কাছে প্রায় ৬০০, ফ্রান্সের কাছে ২৯০ এবং ব্রিটেনের কাছে ২২৫টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। #

















