খুলনা ব্যুরো: দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের প্রান্তিক জনপদ কয়রা উপজেলা যার এক পাশে বিস্তৃত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য ও ঐতিহাসিক নিদর্শনে সমৃদ্ধ এই অঞ্চলটি দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন গন্তব্য হতে পারত। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন অবকাঠামোগত ঘাটতি, পরিকল্পনার অভাব ও দীর্ঘদিনের অবহেলায় পর্যটন খাতে পিছিয়ে রয়েছে কয়রা।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কয়রার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছড়িয়ে থাকলেও পর্যটকদের জন্য নেই মানসম্মত আবাসন, নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা কিংবা প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা। ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এখানে পর্যটকের আগমন খুবই সীমিত।
ঐতিহাসিক নিদর্শনের দিক থেকেও পিছিয়ে নেই কয়রা। উপজেলার মাটির নিচ থেকে আবিষ্কৃত প্রাচীন মসজিদ কুঁড় মসজিদ, রাজা প্রতাপাদিত্যের স্মৃতিচিহ্ন, প্রাচীন দিঘী ও মাজার সব মিলিয়ে এটি একটি সম্ভাবনাময় হেরিটেজ ট্যুরিজম এলাকা হতে পারত। কিন্তু এসব স্থাপনা সংরক্ষণ ও উন্নয়নের কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় পর্যটন মানচিত্রে জায়গা করে নিতে পারেনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়রাকে ঘিরে বিভিন্ন সময় উন্নয়নের কথা বলা হলেও বাস্তবায়ন খুবই সীমিত। বিশেষ করে যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনো বড় বাধা। অনেক এলাকায় সড়ক ভাঙাচোরা, আবার কোথাও নৌপথই একমাত্র ভরসা। এতে পর্যটকদের যাতায়াত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কয়রা উপজেলা জলবায়ু ফোরামের সভাপতি রাসেল আহাম্মেদ বলেন, সুন্দরবনভিত্তিক পর্যটন এই অঞ্চলের জন্য অর্থনৈতিক মুক্তির পথ হতে পারে। কিন্তু সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা ও সরকারি বিনিয়োগ ছাড়া তা সম্ভব নয়।
তিনি মনে করেন, পরিকল্পিত ইকোট্যুরিজম চালু হলে স্থানীয় বনজীবী ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত মানুষ বিকল্প জীবিকার সুযোগ পাবে।
উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান সরদার আবু হাসান বলেন, সরকার যদি এখানে একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলে, তাহলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং মানুষ বননির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে।
এদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোশাররফ হোসেন বিটিসি নিউজকে বলেন, ইকোট্যুরিজম গড়ে তোলা গেলে স্থানীয় তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। একই সঙ্গে অবকাঠামোগত উন্নয়নও ত্বরান্বিত হবে।
উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সভাপতি তরিকুল ইসলাম বিটিসি নিউজকে বলেন, কয়রার তেতুলতলারচর, কাটকাটা, কাশিয়াবাদসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে সুন্দরবনের সৌন্দর্য খুব কাছ থেকে দেখা যায়। অথচ এসব জায়গায় পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি, যা দুঃখজনক, যোগ করেন তিনি।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, পর্যটন খাতের উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগের ঘাটতি রয়েছে। স্থানীয় ভাবে উন্নতমানের হোটেল, রিসোর্ট বা রেস্টুরেন্ট না থাকায় পর্যটকরা দীর্ঘসময় অবস্থান করতে আগ্রহী হন না।
প্রবাসী সাংবাদিক ফরহাদ হুসাইন বিটিসি নিউজকে বলেন, কয়রা সুন্দরবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হতে পারে। হিরণ পয়েন্ট, কটকা বা নলবনের মতো স্থানের নৈকট্য কাজে লাগানো গেলে এখানে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব, বলেন তিনি।
রাজনৈতিক মহলও সম্ভাবনার কথা স্বীকার করছে।
খুলনা জেলা বিএনপির সদস্য এম এ হাসান বিটিসি নিউজকে বলেন, পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা বাড়বে, স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বিটিসি নিউজকে বলেন, কয়রায় পর্যটন শিল্প গড়ে উঠলে স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে বড় পরিবর্তন আসবে। সরকার এ বিষয়ে ইতিবাচকভাবে চিন্তা করছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয়; পরিবেশ সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দিয়ে টেকসই পর্যটন নীতি গ্রহণ করতে হবে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে পর্যটন গড়ে তুলতে না পারলে উল্টো পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, কয়রা এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে অপরিসীম সম্ভাবনা, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের অবহেলা। সঠিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে এই জনপদই হতে পারে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র।
অন্যথায়, সম্ভাবনার এই অঞ্চলটি কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে এমন আশঙ্কাই করছেন সংশ্লিষ্টরা। #













