খুলনা ব্যুরো: মংলা বন্দরকেন্দ্রিক দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা বর্তমানে জ্বালানী সংকটে আটকে পড়েছে। কাগজে-কলমে পরিবহন সচল থাকলেও বাস্তবে নদীপথে থেমে গেছে পণ্য চলাচল। এ সংকটের কারণে রূপসা নদীসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটগুলোতে জাহাজের সারি জমে উঠেছে, আর এই অচলাবস্থা ধীরে ধীরে প্রভাব ফেলছে শিল্প উৎপাদন, বাজার সরবরাহ এবং শ্রমজীবী মানুষের জীবিকায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কেবল সাময়িক জট নয়; বরং সমন্বয়হীন জ্বালানি ব্যবস্থাপনার একটি বড় সংকেত।
খুলনার রূপসা নদী নৌ-পণ্য পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট। এই নৌপথ ব্যবহার করেই নওয়াপাড়া, ফুলতলা, যশোর, খুলনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহন করা হয়।
তবে সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটে এই নদীতে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে নোঙর করে আছে ২০টির বেশি লাইটার জাহাজ। শুধু এই রুটেই নয়, একই সংকটে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন নৌপথে অর্ধশতাধিক পণ্যবাহী জাহাজ স্থবির হয়ে রয়েছে। ফলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আমদানিকৃত পণ্য মংলা বন্দরে আটকে আছে, যা বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করছে।
জাহাজ শ্রমিকদের ভাষ্যে পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট। শ্রমিক ওবায়দুল বলেন, এদিকে তেলও নাই, ওদিকে মালও নাই। এ কারণে আমাদের জাহাজগুলো বসা, আর এই বসে থাকার কারণে মালিকরা ঠিকমতো বেতনও দিতে পারছেন না।
একই চিত্র তুলে ধরে আরেক শ্রমিক ইসরাফিল বলেন, অনেক জাহাজ খালি পড়ে আছে তেলের সংকটের কারণে। জাহাজে লোডও যাইতে পারতেছে না কাছে-কিনারের থেকে। আমরা প্রায় ছয়-সাত দিন ধরে বসে আছি।
নৌপরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সংকট একক কোনো খাতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে।
খুলনা বিভাগীয় অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন মালিক গ্রুপের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোঃ খুরশীদ আলম কাগজী বলেন, চেইন সিস্টেমে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছে। এইভাবে চলতে থাকলে অল্প সময়ের মধ্যেই বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হবে এবং দ্রব্যমূল্যের অনেক বেশি বৃদ্ধি পাবে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ঘাটতি এবং ডিলার পর্যায়ে তেল না পাওয়াই এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট নেতারা জানান, বিভিন্ন দফতরে যোগাযোগ করেও তারা কাঙ্ক্ষিত সমাধান পাচ্ছেন না।
খুলনা বিভাগীয় অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন মালিক গ্রুপের আহ্বায়ক (সর্বনিম্ন দর বাস্তবায়ন কমিটি) মোঃ হাফিজুল ইসলাম চন্দন বলেন, আমরা বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগের চেষ্টা করছি, ডিলারদের কাছেও যাচ্ছি; কিন্তু তেল পাচ্ছি না। এতে আমরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছি। এই অবস্থা চলতে থাকলে নৌপথে পণ্য পরিবহন কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে।
এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংকট নিরসনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। খুলনা জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত বলেন, জ্বালানি তেলসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তদারকির জন্য একজন এডিসিকে ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যেখানে অনিয়ম পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছি।
তবে বাস্তবে এখনো পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। নদীপথে নোঙর করা জাহাজগুলোতে কর্মহীন সময় পার করছেন শত শত শ্রমিক। আয় না থাকায় তাদের পরিবারগুলোও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিভাগীয় অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন খাতের আওতায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই রুটে তিন শতাধিক পণ্যবাহী লাইটার জাহাজ নিয়মিত চলাচল করে। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে বর্তমানে অধিকাংশ জাহাজই অচল হয়ে পড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই সংকট দ্রুত নিরসন না হলে এর প্রভাব পড়বে সরাসরি বাজারে। পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাবে, যা সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। পাশাপাশি শিল্প কারখানাগুলোর কাঁচামাল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে উৎপাদন ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সব মিলিয়ে, রূপসা নদীকেন্দ্রিক এই অচলাবস্থা এখন একটি বড় অর্থনৈতিক সংকটের পূর্বাভাস দিচ্ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি করবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। #















