বিটিসি আন্তর্জাতিক ডেস্ক: তিন দশকের বেশি সময় পর লেবানন ও ইসরায়েল প্রথমবারের মতো কূটনৈতিক আলোচনায় বসেছে। ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে চলমান সংঘাত বন্ধ করার লক্ষ্যেই এই বিরল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, হিজবুল্লাহর প্রভাব কমানোর জন্য এটি একটি ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মঙ্গলবার ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে সরাসরি আলোচনার আয়োজন করেন এবং উভয় পক্ষই জানিয়েছে, তাদের মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে, যদিও তারা শান্তির কোনো কাঠামোতে সম্মত হয়েছে কি না তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, দুই দেশ নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে সরাসরি আলোচনা শুরু করতে সম্মত হয়েছে।
ইসরায়েল বলেছে, তারা হিজবুল্লাহসহ সব অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিরস্ত্র করতে চায়। অন্যদিকে লেবানন যুদ্ধবিরতি এবং মানবিক সংকট মোকাবেলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
উল্লেখ্য, দুই দেশের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই এবং সর্বশেষ উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা হয়েছিল ১৯৯৩ সালে।
এদিকে, ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার কয়েক দিন পর ২ মার্চ থেকে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হয়। এর পর থেকে দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে বৈঠক চলাকালে হিজবুল্লাহ লেবাননে ইসরায়েল ও তাদের সেনাদের ওপর অন্তত ২৪টি হামলার দায় স্বীকার করেছে। একই সময়ে উত্তর ইসরায়েলে ড্রোন ও রকেট হামলার সতর্কবার্তা জারি হয়।
ইসরায়েল জানিয়েছে, তাদের অভিযানের মূল লক্ষ্য হিজবুল্লাহকে দুর্বল ও নির্মূল করা। গাজায় যুদ্ধ চলাকালীন ২০২৩ ও ২০২৪ সালেও তারা এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়েছিল।
আলোচনার পর এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট বলেন, হিজবুল্লাহর প্রভাব কমাতে ইসরায়েল ও লেবানন উভয়ই কাজ করতে সম্মত হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, লেবাননের পক্ষ থেকে দেশে চলমান ‘মারাত্মক মানবিক সংকট মোকাবেলা ও প্রশমনের জন্য যুদ্ধবিরতি এবং সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ’ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, এদিকে যুক্তরাষ্ট্র হিজবুল্লাহর হামলা থেকে আত্মরক্ষার জন্য ইসরায়েলের অধিকারের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
বৈঠকের আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে রুবিও বলেন, এই বৈঠকটি ছিল একটি প্রক্রিয়া।
তিনি বলেন, ‘এতে সময় লাগবে, কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি এই প্রচেষ্টা সার্থক হবে। এটি একটি ঐতিহাসিক বৈঠক, যার ওপর ভিত্তি করে আমরা আরো এগিয়ে যেতে চাই।’
এক বিবৃতিতে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন বলেন, তিনি আশা করেন এই আলোচনা ‘সাধারণভাবে লেবাননের জনগণের এবং বিশেষভাবে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগের অবসানের সূচনা করবে।’
তিনি বলেছেন, এই সংঘাতের একমাত্র সমাধান হবে লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীর এলাকার নিরাপত্তার একক দায়িত্ব গ্রহণ। তবে হিজবুল্লাহর মোকাবেলায় লেবানন সরকারের সক্ষমতা সীমিত।
আলোচনার আগে সংগঠনটির একজন ঊর্ধ্বতন সদস্য এপি সংবাদ সংস্থাকে বলেন, ওয়াশিংটনে সম্মত হওয়া কোনো মীমাংসা তারা মানবে না। হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য ওয়াফিক সাফা বলেন, ‘তারা যা মেনে নিয়েছে, তা মানতে আমরা বাধ্য নই।’
হিজবুল্লাহ হলো ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি সুসজ্জিত ও অত্যাধুনিক মিলিশিয়া গোষ্ঠী। যারা লেবাননের প্রধানত শিয়া অধ্যুষিত দক্ষিণাঞ্চলে এবং রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরগুলোতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে রয়েছে। এই গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত রাজনীতিবিদরা সরকারের দুটি মন্ত্রিসভাস্তরের পদেও অধিষ্ঠিত আছেন।
ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধে গোষ্ঠীটি প্রবেশ করার পর থেকে লেবাননের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ক্রমশই তিক্ত হয়ে উঠেছে। ইরানই হলো তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক।
পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অনুষ্ঠিত পৃথক আলোচনায়, ইরানি আলোচকরা যেকোনো যুদ্ধবিরতিতে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করার ওপর জোর দেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়ই তা করতে বারণ করে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, ইসলামাবাদে ইরানের সঙ্গে আলোচনা নিশ্চিত হওয়ার এক মাস আগেই ইসরায়েল-লেবানন আলোচনার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
সর্বশেষ সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এই সংঘর্ষে দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার পাশাপাশি প্রায় দশ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
বৈঠকে যা হলো
বৈঠকের পর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর একটি বিবৃতি প্রকাশ করে জানায়, উভয় পক্ষ সরাসরি আলোচনা শুরুর পদক্ষেপ নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা করেছে।
প্রতিটি দেশের অবস্থান তুলে ধরা হলেও, তারা কোনো সাধারণ সমঝোতায় পৌঁছেছে কি না তা বলা হয়নি। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘উভয় পক্ষই পারস্পরিকভাবে সম্মত একটি সময় ও স্থানে সরাসরি আলোচনা শুরু করতে সম্মত হয়েছে।’
ওয়াশিংটনে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লাইটার বলেন, লেবানন সরকার আলোচনা চলাকালীন এটা স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা আর ইরান-সমর্থিত লেবানিজ মিলিশিয়া হিজবুল্লাহর দখলে থাকবে না।
ইসরায়েল লেবাননের ওপর হামলা বন্ধ করবে কি না, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলতে রাজি হননি।
লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা মোয়াদ এই প্রাথমিক বৈঠকটিকে গঠনমূলক বলে বর্ণনা করেছেন।
রয়টার্সকে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, বৈঠকে তিনি যুদ্ধবিরতি, বাস্তুচ্যুত মানুষদের নিজ বাড়িতে প্রত্যাবর্তন এবং সংঘাতের কারণে লেবাননে সৃষ্ট মানবিক সংকট নিরসনে পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির এক সপ্তাহ পর মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের এক সংকটময় মুহূর্তে এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হলো। #















