বিটিসি আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের বন্দরগুলোতে যাতায়াতকারী জাহাজের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত নৌ অবরোধ কার্যকর হওয়ার পর ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক অর্থনীতি এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) সকাল থেকে এই অবরোধ কার্যকর করে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)।
এর ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের মূল্য ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ১০২ ডলারের উপরে অবস্থান করছে।
আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে ভারত এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে, কারণ দেশটির পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই বিদেশ থেকে আসে এবং এর একটি বিশাল অংশ হরমুজ প্রণালি হয়ে পরিবহন করা হয়।
আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হর্ষ পন্থের মতে, ভারতের তেলের চাহিদার অর্ধেক এবং তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির প্রায় ৬০ শতাংশই এই প্রণালি দিয়ে আসে।
এলপিজি আমদানির ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশ নির্ভরতা রয়েছে এই জলপথের ওপর।
যদিও ভারত সরকার দাবি করেছে যে তাদের জ্বালানি সরবরাহ বর্তমানে নিরাপদ রয়েছে এবং আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা হয়েছে, তবুও কাতার থেকে আসা দুই-তৃতীয়াংশ এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কাতারের রাস লাফান গ্যাস ফিল্ডে হামলার পর উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ভারতীয় শিল্প কোম্পানিগুলোকে ইতিমধ্যে এলএনজি সরবরাহ ২০ শতাংশ কমানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এই জ্বালানি সংকট কেবল পরিবহন খাতে নয়, বরং ভারতের কৃষি ও ওষুধ শিল্পেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ভারতের কৃষি খাতের জন্য অপরিহার্য ইউরিয়া ও অন্যান্য সারের কাঁচামালের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। বিশেষ করে ইউরিয়া তৈরির প্রধান উপাদান প্রাকৃতিক গ্যাসের ৮৫ শতাংশই আসে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে।
হর্ষ পন্থ সতর্ক করেছেন, এই সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে আসন্ন জুন-জুলাই মাসের বীজ বপনের মৌসুমে কৃষকরা মারাত্মক সংকটে পড়বেন।
এছাড়া ভারতের শক্তিশালী জেনেরিক ওষুধ শিল্পও ঝুঁকির মুখে। ব্যথানাশক ও অ্যান্টিবায়োটিক তৈরির প্রয়োজনীয় পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের একটি বড় অংশ দুবাই ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে পৌঁছায়।
পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং রুটের দীর্ঘসূত্রতার কারণে ওষুধসহ নিত্যপণ্যের মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিকভাবে ভারত ইতিমধ্যে এই যুদ্ধের আঁচ পেতে শুরু করেছে।
রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া ২০২৭ অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ দশমিক ৯ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। ডলারের বিপরীতে টাকার মান সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছানো এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সরকারের বাণিজ্য ও রাজস্ব ঘাটতি উভয়ই বাড়বে।
একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত প্রায় ৯০ লক্ষ ভারতীয় শ্রমিকের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপরও এই যুদ্ধের প্রভাব পড়তে পারে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প মূলত চীন ও ভারতের মতো দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই এই অবরোধকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। যুদ্ধের অবসান দ্রুত না হলে ভারতের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার হতে দীর্ঘ সময় লাগবে। #















