বিটিসি আন্তর্জাতিক ডেস্ক: লাস ভেগাসের উদ্দেশে যাত্রার আগে গতকাল বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) হোয়াইট হাউসের সাউথ লনে দাঁড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধের বিষয়ে এ পর্যন্ত তার সবচেয়ে আশাবাদী মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেদিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি রয়েছি। তারা এতে (পরমাণু অস্ত্র না রাখার বিষয়ে) পুরোপুরি একমত হয়েছে। তারা প্রায় সবকিছুতেই রাজি হয়েছে, তাই হয়তো তারা যদি আলোচনার টেবিলে বসে, তাহলেই পার্থক্যটা ঘুচে যাবে।’
তিনি আরও এক ধাপ বাড়িয়ে বলেন, ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর করতে রাজি হয়েছে—যেগুলো আরও সমৃদ্ধ করলে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা সম্ভব।
গত বছরের জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ বোমারু বিমানের হামলার কথা উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “আমাদের হামলার কারণে মাটির অনেক গভীরে থাকা ‘পরমাণু ধূলিকণা’ (নিউক্লিয়ার ডাস্ট) তারা আমাদের ফিরিয়ে দিতে রাজি হয়েছে।”
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, একটি চুক্তি হয়তো এই ‘সপ্তাহান্তেই’ হয়ে যেতে পারে। তিনি আরও জানান, যদি ইসলামাবাদে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তবে তিনি নিজেই সেখানে যাওয়ার কথা বিবেচনা করবেন। ট্রাম্প বলেন, ‘যদি ইসলামাবাদে চুক্তি সই হয়, তবে আমি (সেখানে) যেতে পারি। তারা চায় আমি যেন যাই।’ খবর আলজাজিরার।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে।
মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই নিশ্চিত করেছেন যে, পাকিস্তানের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান চলছে, তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিষয়ে ইরান অটল রয়েছে। বাঘাই বলেন, ইরান তার প্রয়োজন অনুযায়ী সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত রাখতে পারবে।
এদিকে, কোনো ইরানি কর্মকর্তাই দেশের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ছেড়ে দিতে রাজি হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেননি। তেহরানের প্রকাশ্য অবস্থান হলো—ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ তাদের একটি সার্বভৌম অধিকার, যা অপরিবর্তিত রয়েছে।
২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তেহরানে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আসিফ দুররানি বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে কেবল ‘পার্থক্য’ বা ‘গ্যাপ’ রয়েছে—এভাবে পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করা বিভ্রান্তিকর।
তিনি আলজাজিরাকে বলেন, ‘আসলে কোনো গ্যাপ নেই। ট্রাম্প যদি এনপিটি (পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ চুক্তি) পড়ে থাকেন, তবে তিনি জানতেন যে, প্রতিটি দেশেরই শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার রয়েছে। ইরান বারবার বলেছে যে তারা অস্ত্র চায় না। তারা এনপিটি এবং জেসিপিওএ এর কাঠামোর মধ্যে থেকে বেসামরিক পারমাণবিক ব্যবহার চায়।’
এনপিটি লক্ষ্য হলো পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ করা এবং একই সাথে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি ও নিরস্ত্রীকরণকে উৎসাহিত করা।
অন্যদিকে, জেসিপিওএ বা ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিটি ছিল ইরান ও বিশ্বের ছয়টি শক্তির মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা, যার মাধ্যমে তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করা হয়েছিল এবং আন্তর্জাতিক তদারকির বিনিময়ে তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি থেকে সরে আসে এবং পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যার ফলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর থাকা সীমাবদ্ধতাগুলো ধীরে ধীরে শিথিল হতে শুরু করে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক সৈয়দ মুজতবা জালালজাদেহ বলেন, বাস্তব পরিস্থিতি প্রকাশ্য বিবৃতির চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
তিনি আলজাজিরাকে বলেন, এক পক্ষ মিথ্যা বলছে—এ ধরনের সরলীকৃত দ্বন্দ্বে জড়ানো আমাদের উচিত হবে না। ট্রাম্পের মন্তব্য এবং ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবস্থানের মধ্যে যে ব্যবধান দেখা যাচ্ছে, তা মূলত এই আলোচনার জটিল, বহুমাত্রিক এবং অসমাপ্ত প্রকৃতিরই প্রতিফলন।
জালালজাদেহ আরও বলেন, ট্রাম্প যখন ‘সম্পূর্ণ ঐকমত্যের’ কথা বলেন, তখন তিনি সম্ভবত আলোচনার সম্ভাব্য সবচেয়ে ইতিবাচক দিকটিকেই তুলে ধরছেন।
ট্রাম্পের মন্তব্য কি পর্দার আড়ালের প্রকৃত অগ্রগতির প্রতিফলন নাকি আগামী ২২ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির সময়সীমার আগে একটি চাপের কৌশল—তা এখনো অস্পষ্ট। তবে ট্রাম্প এবং ইরানের বর্ণনা একই আলোচনা সম্পর্কে সম্পূর্ণ দুটি ভিন্ন চিত্র ফুটিয়ে তুলছে।
পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা
বৃহস্পতিবার সবচেয়ে ব্যস্ততম কূটনৈতিক তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে তেহরানে। সেখানে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ধারাবাহিক বেশ কিছু উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন।
আসিম মুনির দেখা করেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের সঙ্গে, যিনি গত শনিবার ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এরপর তিনি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গেও বৈঠক করেন।
এছাড়া আসিম মুনির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অপারেশনাল কমান্ড ‘খাতাম আল-আম্বিয়া’ কেন্দ্রীয় সদরদপ্তরের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহির সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন।
আসিম মুনির যখন তেহরানে ইরানি নেতাদের সঙ্গে ব্যস্ত ছিলেন, তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ একটি সমান্তরাল পথ অনুসরণ করছিলেন। তিনি সৌদি আরব এবং কাতারের উপসাগরীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তুরস্কের ‘আনাতালিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরামে’ পৌঁছান।
এই আলোচনায় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ভূমিকার কথা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষই স্বীকার করেছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলান লেভিট বলেছেন, পরবর্তীতে সরাসরি কোনো আলোচনা হলে তা সম্ভবত ইসলামাবাদেই অনুষ্ঠিত হবে।
ক্যারোলাইন লেভিট আরও বলেন, ‘পুরো প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানিরা অবিশ্বাস্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে। এই চুক্তিটি সম্পন্ন করার জন্য তাদের বন্ধুত্ব এবং প্রচেষ্টার আমরা সত্যিই প্রশংসা করি। বর্তমানে এই আলোচনায় তারাই একমাত্র মধ্যস্থতাকারী।’
তবে সাবেক কূটনীতিক আসিফ দুররানি সতর্ক করে বলেছেন, পাকিস্তানের ভূমিকারও একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান কেবল এই বৈঠকটিকে সহজতর করছে এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বড়জোর কিছু পরামর্শ দিতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবকিছু নির্ভর করছে দুই পক্ষের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।’
সেই রাজনৈতিক সদিচ্ছা এখন বড় পরীক্ষার মুখে, কারণ আগামী ২২ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির সময়সীমা শেষ হতে চলেছে।
পাকিস্তানের সরকারি সূত্রগুলো আলজাজিরাকে জানিয়েছে, গত এক সপ্তাহে সাংবাদিকদের কাছ থেকে প্রায় ১০০টি ভিসার আবেদন জমা পড়েছে।
এদিকে, সম্ভাব্য একটি উচ্চপর্যায়ের ইভেন্টের প্রত্যাশায় রাজধানী ইসলামাবাদে নিরাপত্তা জোরদার করা শুরু হয়েছে—যা হতে পারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য সফর, অথবা অন্তত তেহরান ও ওয়াশিংটনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে আরেক দফার উচ্চপর্যায়ের আলোচনা। #















