বিটিসি আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুদ্ধ থেকে শান্তির পথে দেশকে নিয়ে যাওয়ার কঠিন দায়িত্ব নেওয়া সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের সমাজকল্যাণ ও শ্রম বিষয়ক মন্ত্রীর পদে রয়েছেন হিন্দ কাবাওয়াত।
প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার প্রশাসনে থাকা একমাত্র এ নারী মন্ত্রী চেষ্টা করছেন প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া দেশটির দরিদ্র নারীদের সহায় হতে, পাশে দাঁড়িয়ে তাদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।
যদিও শারা-র সরকারের প্রথম কয়েক মাস তেমন কোনো আশা দেখাতে পারছে না। এরই মধ্যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, যার জন্য সরকারকেই দায়ী করছে সংখ্যালঘুরা।
সে দায় মেনে নিয়েই খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী কাবাওয়াত বিবিসিকে বলছেন, “রূপান্তরের সময়ে এ ধরনের ভুলত্রুটি হতেই পারে।”
বাশার আল-আসাদ পরিবারের কয়েক দশকের ‘নির্মম’ শাসনকালের পর ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর সাবেক আল-কায়েদা নেতা আহমেদ আল-শারা নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহীরা রাজধানী দামেস্ক দখল করে।
এরপর তার নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারে জায়গা পান কাবাওয়াত, যিনি নির্বাসনে থেকে আসাদবিরোধী নানা কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন।
“প্রথম দিনই আমি জিজ্ঞেস করি, আরও নারী নেই কেন?” বলেন গত বছরের মার্চে মন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া কাবাওয়াত।
সাবেক ক’জন যোদ্ধা আর ঘনিষ্ঠদের নিয়ে গঠিত শারা’র মন্ত্রিপরিষদে যে আর কোনো নারী নেই, সেটিও প্রেসিডেন্টের বড় ভুলগুলোর একটি বলে মনে করেন তিনি। যদিও শারা তাকে আশ্বস্ত করেছেন, সামনে আরও নারীকে দেখা যাবে।
সিরিয়াজুড়ে বহু বছর ধরে কাজ করা কাবাওয়াতের মূল নজর দেশটির সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের ওপর, যাদের মধ্যে রয়েছে এতিম, বিধবা ও আসাদের শাসনামলে নিখোঁজ হাজারো পরিবারের সদস্যরা।
তাকে জরুরি কিছু অগ্রাধিকারও সামলাতে হচ্ছে। প্রায় ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধে বাস্তুচ্যুত লোকজনের ঘর, চাকরি যোগাড়ের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা থেকে পালানোর লোকজনকেও নানান সহযোগিতা করতে হচ্ছে।
“ভেঙে পড়া একটি দেশে সবকিছুই জরুরি,” বলেছেন কাবাওয়াত।
জানুয়ারিতে তিনি আলেপ্পোতে গিয়ে সেখানকার আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছেন, যারা সরকারি বাহিনী ও কুর্দি-নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে লড়াইয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গত গ্রীষ্মে তিনি দ্রুজ, বেদুইন ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে হওয়া প্রাণঘাতী সংঘাতের পর একটি দ্রুজ-অধ্যুষিত শহরে ত্রাণ নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি এমনকী এক আলাওয়াইত নারীর কাছেও গেছেন, যাকে সামরিক বাহিনীর পোশাক পরা কয়েকজন ধর্ষণ করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ সব কিছুর মধ্যেও কাবাওয়াত জোর দিচ্ছেন জবাবদিহিতায়।
“রূপান্তরকালে, যুদ্ধপরবর্তী সময়ে ভুল হয়ই। প্রেসিডেন্টসহ কেউই এ নিয়ে খুশি নন। কিন্তু এসব অপরাধ করা অনেককে এরই মধ্যে কারাগারে পাঠানো হয়েছে,” বলেছেন তিনি।
সিরিয়া, লেবানন, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করা এ নারী আইনজীবী ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও সুপরিচিত। নির্বাসনে থাকা আসাদবিরোধীদের এক জায়গায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও পালন করেছিলেন।
অবশ্য ‘সংলাপই’ তার সবচেয়ে ধারাল অস্ত্র।
“৫০ বছরের স্বৈরশাসনের পর ‘আমরা আপনাকে বিশ্বাস করি’ এটা বলতে লোকজনের সময় লাগবে,” মানুষে-মানুষে বিশ্বাসের পাশাপাশি সরকার ও জনগণের মধ্যে বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ার গুরুত্বের কথা তুলে ধরতে গিয়ে বলেন কাবাওয়াত।
ইদলিবে তিনি নারীদের বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনে জড়িয়েছেন, তাদেরকে সর্বস্তরে নেতৃত্বের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। তা সত্ত্বেও নতুন অন্তর্বর্তী পার্লামেন্ট বা গণপরিষদের সদস্য বেছে নিতে যে পরোক্ষ নির্বাচন হয়েছে সেখানে ইদলিব থেকে কোনো নারী নির্বাচিত হননি।
ওই পার্লামেন্টের মাত্র ৪% আসনে নারীরা জায়গা করে নিতে পেরেছেন।
এ নিয়ে ইদলিবের নারী নেত্রীদের বকাঝকাও করেছেন কাবাওয়াত।
“আপনাদের একতাবদ্ধ হওয়া উচিত ছিল এবং বুদ্ধিমানের মতো ভাবা উচিত ছিল যেন আমরা এক-দুইজনকে নির্বাচিত করতে পারতাম,” নির্বাচনে অংশ নেওয়া নারীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন তিনি।
নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে এ নারী মন্ত্রী বলেন, “আমি এখানে শোভা বাড়াতে আসিনি, আমি নিজেকে সিরিয়ার একজন নাগরিক মনে করি। যে মুহূর্তে আমি নিজেকে সংখ্যালঘু বা নারী মনে করা শুরু করবো, আমি বৈধতা হারিয়ে ফেলবো।”
ইদলিবেরই এক শরণার্থী শিবিরে গিয়ে কাবাওয়াত বিধবা ও ভয়াবহ দারিদ্র্যে জীবন কাটানোর শিশুদের কথা শুনেছেন। তাদের কাছ থেকে জানতে চেয়েছেন, কারা কারা হস্তশিল্পের কাজ শিখতে চান, যা আন্তর্জাতিকভাবে বিক্রি করা সম্ভব।
“আমি মানুষের কষ্ট দেখছি, এবং এর জন্য দায় অনুভব করছি,” বলেছেন তিনি।
সরকার সংস্কারের কাজ ধীরগতিতে করছে এমন সমালোচনার জবাবে এ নারী বলেন, “আমরা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া একটি দেশ পেয়েছি, এখন নতুন দেশ গড়ে তোলার জন্য আইন তৈরি করছি—এতে সময় লাগছে।”
আসাদ আমলে মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশটির ওপর যেসব নিষেধাজ্ঞা ছিল, তার প্রায় সবই উঠে গেছে। আসছে কোটি কোটি ডলার অর্থ সহায়তা। তারপরও সিরিয়ার পুনর্গঠন বেশ চ্যালেঞ্জের। কেবল অবকাঠামো পুনর্নির্মাণেই দেশটিতে অন্তত ২০ হাজার কোটি ডলার লাগবে বলে অনুমান বিশ্ব ব্যাংকের, আবার অঞ্চলজুড়ে থাকা অস্থিরতায় ওই কাজ সহজে শুরু ও শেষ করা যাবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহও থাকছে।
তারপরও কাবাওয়াতের বার্তা স্পষ্ট—বিশ্বাস, সংলাপ আর অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন।
“যথেষ্ট হয়েছে, অনেক কান্নাকাটি হয়েছে। এটা আরেকটা দিন, ফের কাজে নেমে পড়তে হবে,” বলেন কাবাওয়াত। #















