BTC News | বিটিসি নিউজ

আজ- মঙ্গলবার, ১৩ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৯শে পৌষ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৪শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি

আজ- ১৩ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সর্বশেষ তিন সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রতিবেদনে যেসব সুপারিশ করেছে কমিশন

সর্বশেষ তিন সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রতিবেদনে যেসব সুপারিশ করেছে কমিশন

বিশেষ (ঢাকা) প্রতিনিধি: ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিশন আজ সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

প্রতিবেদনে সর্বশেষ তিনটি নির্বাচন কীভাবে দেশের ‘নির্বাচন ব্যবস্থা’কে কলুষিত করেছে তা তুলে ধরা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে কেউ যেন এ ধরনের নির্বাচন করতে না পারে সে লক্ষ্যে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন, কমিশন প্রধান সাবেক বিচারক বিচারপতি শামীম হাসনাইন, কমিশন সদস্য শামীম আল মামুন, কাজী মাহফুজুল হক সুপণ, ব্যারিস্টার তাজরিয়ান আকরাম হোসেন, ড. আব্দুল আলীম।

এছাড়া উপস্থিত ছিলেন, আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, তথ্য উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান, সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীও উপস্থিত ছিলেন।

তদন্ত প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ

২০১৪ সালে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং অবিশষ্ট ১৪৭টিতে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতা’র নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণ সাজানো ও সুপরিকল্পিত।

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে এ বন্দোবস্ত করা হয়েছিল।

২০১৪ সালের নির্বাচন সারা বিশ্বে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন হিসেবে সমালোচিত হওয়ায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ করার মিশন গ্রহণ করে। বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দল তাদের এ সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বুঝতে না পেরে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।

তদন্ত কমিশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০১৮ সালে ৮০% কেন্দ্রে রাতের বেলায় ব্যালট পেপারে সিল মেরে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করে রাখা হয়। আওয়ামী লীগকে জেতাতে প্রশাসনের মধ্যে এক ধরনের অসৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। ফলে কোন কোন কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার ১০০% এর বেশি হয়ে যায়।

২০২৪ সালে বিএনপিসহ বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ না দেওয়ায় ‘ডামি’ প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ করার অপকৌশল গ্রহণ করা হয়।

তিনটি নির্বাচনের অভিনব পরিকল্পনা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হয় এবং বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়। কিছু কর্মকর্তার সমন্বয়ে বিশেষ সেল গঠন করা হয় যা নির্বাচন সেল নামে পরিচিত লাভ করে।

২০১৪-২০২৪ পর্যন্ত সময়কালে নির্বাচন ব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে মূলত প্রশাসনের হাতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময়ে কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনই হয়ে উঠে নির্বাচন পরিচালনার মূল শক্তি।

তিনটি সংসদ নির্বাচনের নির্বাচনি অনিয়মে কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারি যুক্ত থাকায় এবং তদন্ত কমিশনের জন্য বরাদ্দকৃত সময় অপ্রতুল হওয়ায় সুনির্দিষ্টভাবে এদের নাম ও কার কী ভূমিকা ছিল তা বের করা সম্ভব হয়নি।

উক্ত নির্বাচনগুলোতে যেসব কর্মকাণ্ড নির্বাচন ব্যবস্থাকে কলুষিত করেছে তার তালিকা—

(১) তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল, (২) নির্বাচনি কৌশল নির্ধারণ ও নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং সশস্ত্র বাহিনীর মনোনীত একটি অংশকে ব্যবহার, (৩) বিরোধী প্রার্থী ও কর্মীদের নামে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের, (৪) বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের অজামিনযোগ্য মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার ও গুম, (৫) জাল ভোট প্রদান, (৬) নির্বাচনি কারচুপিতে নির্বাহি বিভাগকে ব্যবহার, (৭) ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো, (৮) ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের প্রবেশে বাধা, (৯) অনিয়মতান্ত্রিকভাবে সংসদীয় সীমানা নির্ধারণ, (১০) আগে থেকেই ব্যালট বাক্সে ভোট ভরে রাখা, (১১) ভোট প্রদানের হারে পরিবর্তন, (১২) ভোটকেন্দ্রে গণমাধ্যম কর্মীদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ, (১৩) একতরফাভাবে সরকারের আজ্ঞাবহ প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনার নিয়োগ, (১৪) প্রার্থীদের ভয়ভীতি, প্রলোভন দেখিয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার, (১৫) নির্বাচনের পরে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনি পরিসংখ্যান প্রকাশ না করা, (১৬) নির্বাচনের পরে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট নথি ও তথ্য ধ্বংস করা, (১৭) নির্বাচনি অভিযোগ সঠিক ও সুষ্ঠুভাবে তদন্ত না করা, (১৮) নির্বাচনে ডামি প্রার্থী দাঁড় করানো, (১৯) বিরোধী রাজনৈতিক দলে ভাঙনের চেষ্টা, (২০) নির্বাচনি পর্যবেক্ষণ নিবন্ধনে পক্ষপাতিত্ব, (২১) রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনে বৈষম্য, (২২) নির্বাচনের নামে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়।

সুপারিশ

(০১) নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী প্রস্তাবিত আইন প্রণয়ন এবং সে অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করতে হবে।

(০২) নির্বাচন কমিশনের দায়বদ্ধতা

নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহিতার একটি ব্যবস্থা থাকা জরুরী-যাতে কমিশন স্বেচ্ছাচারী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে না পারে। এজন্য একটি স্থায়ী নির্বাচন তদন্ত কমিশন গঠন করা যেতে পারে। তবে এ ধরণের কমিশন গঠনে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতার মাত্রা যাতে কোনভাবেই খর্ব না হয়, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে।

(০৩) নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণ

স্বাধীন সীমানা নির্ধারণ কমিশন গঠন: সংবিধান ও আইনে আলাদা সীমানা নির্ধারণ কমিশন গঠন করে সীমানা নির্ধারণের পুরো ক্ষমতা সেখানে দিতে হবে। নির্বাচন কমিশন শুধু প্রশাসনিক সমন্বয় করবে। কানাডা, যুক্তরাজ্য সহ বহু দেশে এভাবে স্বাধীন সীমানা নির্ধারণ কমিশনের মাধ্যমে দলীয় স্বার্থে মানচিত্র বদল অনেকটাই ঠেকানো গেছে। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন প্রতিবেদনেও আলাদা সীমানা নির্ধারণ কমিশন গঠনে সংবিধান সংশোধনের সুপারিশ করা হয়েছে।

একাধিক পরামর্শ-ধাপ: সীমানা পুনর্নির্ধারণ দুই-তিন মাসের প্রশাসনিক কাজ হিসেবে নয়, অন্তত ১৮-২৪ মাসের বহু-ধাপের প্রক্রিয়া হিসেবে আইনে বেঁধে দিতে হবে। প্রথম ধাপে নীতিমালা ও তথ্য প্রকাশ, দ্বিতীয় ধাপে খসড়া মানচিত্র, তৃতীয় ধাপে সংশোধিত খসড়া— এভাবে প্রতিটি ধাপে লিখিত আপত্তি প্রদান ও সরাসরি শুনানি গ্রহণের ব্যবস্থা থাকা উচিত।

২০০৮ সাল থেকে সীমানা নির্ধারণে সিইজিআইএসকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সিইজিআইএসকে ব্যবহার করে নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক বিবেচনায় ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনেক আসনের সীমানায় পরিবর্তন আনে। ভবিষ্যতে সীমানা নির্ধারণে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন সুপারিশকৃত এতদসংক্রান্ত আ্াইন বাস্তবায়ন করতে হবে এবং সিইজিআইএসকে সীমানা নির্ধারণের কার্যক্রম থেকে বিরত রাখতে হবে।

স্পষ্ট সংখ্যাগত মানদণ্ড: প্রতি আসনে ভোটার সংখ্যা জাতীয় গড়ের কতশতাংশ বেশি-কম হতে পারবে সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট আইনি বিধান থাকতে হবে। সাধারাণত তা ১০-১৫% এর মধ্যে থাকা উচিত। কোন পরিস্থিতিতে এর ব্যতিক্রম করা যাবে এবং প্রতি পুনর্নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় মোট কত শতাংশ আসনের সীমানা বদলানো যাবে (যেমন ৫-১০% এর বেশি নয়) তা নির্ধারণ করে দিতে হবে।

পূর্ণ স্বচ্ছতা: প্রতিটি আসনের জন্য ব্যবহৃত আদমশুমারি তথ্য, বর্তমান ও প্রস্তাবিত মানচিত্র, এবং কেন কোন এলাকা কোথায় স্থানান্তর করা হচ্ছে— এসব তথ্য সাধারণ মানুষের জন্য সহজ বাংলায় ব্যাখ্যাসহ উন্মুক্ত অনলাইন পোর্টালে দিতে হবে। এ সংক্রান্ত কমিটির মিটিংয়ে আলোচিত (গোপনীয় অংশ বাদে) বিষয়াদি, লিখিত আপত্তি, এবং নিষ্পত্তির যুক্তিও অনলাইনে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা উচিত। কমিশনের তদন্তের মধ্য দিয়ে অভিযোগ পাওয়া গেছে যে বেগিত ৩টি নির্বাচনের আগে গঠন করা অভ্যন্তরীণ সীমানা পুনর্নির্ধারণ কমিটির কিছু সদস্য কখনো কখনো নির্দিষ্ট রাজনীতিবিদদের সুবিধার্থে সীমানা পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে অনৈতিক প্রণোদনা গ্রহণ করেছেন। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এবং এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যাতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বজায় রাখা যায়। সীমানা পুনর্নির্ধারণের পুরো প্রক্রিয়াটি, যেখানে বিভিন্ন অংশীদারের অধিকার জড়িত, তা আরও বিস্তৃত পরামর্শের মাধ্যমে সম্পন্ন করা উচিত এবং প্রক্রিয়ায় অনৈতিক প্রভাব কমানোর জন্য একাধিক পরামর্শ গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় সময় নিয়ে সম্পন্ন করা উচিত।

ডিজিটাল আর্কাইভ ও বাধ্যতামূলক নথি সংরক্ষণ : প্রতিটি এলাকা নির্ধারণ প্রক্রিয়ার সব নথি (মানচিত্র, তথ্য, মিটিং এ আলোচিত বিষয়, চিঠিপত্র) ডেটাবেইজে রাখতে হবে, অন্তত ২০-২৫ বছর পর্যন্ত। এতে ভবিষ্যতে কেবল রাজনৈতিক স্মৃতির ওপর নয়, প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বিচারিক পর্যালোচনা: নির্বাচন বা ফল ঘোষণা হওয়ার আগে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সীমানা নির্ধারণের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ থাকতে হবে। সুতরাং, RPO (Representation of the People Order, 1972)-এ সংশোধনী আনা উচিত এই বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত করার জন্য।

(০৪) রাজনৈতিক দল নিবন্ধন

২০১৪ সালে নিবন্ধন করা দল— বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট ও বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট এবং ২০১৭ সালে নিবন্ধন করা দল বিএসপি এবং বিএনএমের নিবন্ধন স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পুনর্যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালা, ২০০৮ এ ‘কার্যকারিতা’র সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, ৭(৫) বিধি সংশোধন করে ১৫ দিনের মধ্যে কার্যকারিতা প্রমাণের সুযোগ বাতিল করতে হবে এবং ১০% তথ্য নিয়ে যাচাইয়ের পদ্ধতি বাতিল করে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের বিধান অনুযায়ী তথ্য যাচাইয়ে বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে হবে।

বিধিমালা সংশোধন করে কেন্দ্রীয় দপ্তর, জেলা ও উপজেলা দপ্তরের মানদণ্ড নিরূপণ করহে হবে।

বিধিমালায় রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিলে সুনির্দিষ্ট ও সুষ্পষ্ট মানদণ্ড সংযুক্ত করতে হবে।

রাজনৈতিক দল নিবন্ধন কার্যক্রমে সকল গোয়েন্দা সংস্থাকে দূরে রাখতে আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে হবে।

আদালতের হস্তক্ষেপে নিবন্ধন বন্ধ করার জন্য আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে হবে।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী প্রতি ৫ বছর পর পর দলের নিবন্ধন নবায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে।

(০৫) ডামি ও বিনা ভোটের নির্বাচন

নির্বাচনের সকল কার্যক্রমে সকল গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা বন্ধ করতে হবে। তবে নির্বাচন কমিশন যদি নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোন কাজে তাদের সহায়তা গ্রহণ প্রয়োজনীয় মনে করে, তা হলে তা নিতে পারবে এধরনের বিধান প্রণয়ন করতে হবে।

(০৬) নির্বাচনি প্রচারণা

প্রধানমন্ত্রী এক বছর আগে থেকেই নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করেন। দল ও প্রার্থীর জন্য নির্বাচন কমিশনের আচরণ বিধিমালা শুধুমাত্র নির্বাচনকালীন প্রযোজ্য বিধায় সরকারি অর্থে পরিচালিত এ কার্যক্রম বন্ধ করা যায় না। এতে নির্বাচনের মাঠ অসমতল থাকে। তাই এ ধরনের প্রচারণা বন্ধে আইন প্রণয়ন করতে হবে।

(০৭) সচিব ও অন্যান্য কর্মকর্তা নিয়োগ

প্রশাসন ক্যাডার থেকে কোন কর্মকর্তা প্রেষণে নিয়োগ দেয়া যাবে না।

প্রশাসনের বাইরে থেকে সচিব নিয়োগের জন্য বিধিমালা প্রণনয় করতে হবে।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রিটার্নিং ও সহকারি রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হবে। এ দায়িত্ব পালনের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক কমিশনের কর্মকর্তা পাওয়া না গেলে প্রশাসনসহ অন্য ক্যাডার থেকে নিয়োগ করতে হবে।

প্রণীত নির্বাচন সার্ভিস দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।

(০৮) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ

সরকারি অর্থ ব্যয় করে বিদেশি অপেশাদার পর্যবেক্ষক আমন্ত্রণ বন্ধে বিধিমালা প্রণয়ন করহে হবে।

পর্যবেক্ষক নিবন্ধনের সকল পর্যায়ে গোয়েন্দা সংস্থার অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধে আইন প্রণয়ন করতে হবে।

(০৯) গণমাধ্যম নীতিমালা

নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রদত্ত বৈধ কার্ডধারী সাংবাদিক সরাসরি ভোটকেন্দ্রে কারো অনুমতি না নিয়েই প্রবেশ করতে পারবেন, অর্থাৎ নতুন করে কারো কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে না।

কোনো রকম অনুমতি ছাড়াই ভোটগ্রহণ কার্যক্রমের তথ্য সংগ্রহ, ছবি তোলা এবং ভিডিও ধারণ করতে পারবেন, তবে কোনোক্রমেমেই গোপন কক্ষের ভেতরের ছবি ধারণ করতে পারবেন না। তবে শর্ত থাকে যে, গোপন কক্ষে কোনো অনিয়মের ঘটনা ঘটলে সে ছবি/ভিডিও ধারণ করতে পারবেন।

সাধারণভাবে একটি ভোটকক্ষে একসঙ্গে একটি গণমাধ্যমের সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফার প্রবেশ করতে পারবেন। তবে বিশেষ কারণে যেমন: বিশিষ্ট ব্যক্তির ভোট প্রদানের ছবি তুলতে/ভিডিও ধারণ করতে, কিংবা অনিয়মের ছবি তুলতে/ভিডিও ধারণ করতে একাধিক সাংবাদিক একসঙ্গে ভোটকক্ষে প্রবেশ করতে পারবেন।

সাংবাদিকগণ ভোটগণনা কক্ষে ভোট গণনা দেখতে পারবেন, ছবি নিতে পারবেন, তবে সরাসরি সম্প্রচার করতে পারবেন না। তবে শর্ত থাকে যে, গণনার সময় কোনো অনিয়মের ঘটনা ঘটলে সরাসরি সম্প্রচার করতে পারবেন।

(১০) ইলেকশন ইনকোয়ারি কমিটি

জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশনের দৃষ্টিতে, বর্তমান কাঠামোতে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও ইনকোয়ারি কমিটিকে নির্বাচন-ব্যবস্থার “গণতান্ত্রিক সুরক্ষা-বলয়” হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে তাদের ক্ষমতা খর্বিত, অর্থবহ ভূমিকা সীমিত এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে জিম্মি।

জেলা ও দায়রা জজ এবং অন্যান্য বিচারিক কর্মকর্তাদের নির্বাচনকালীন আর্থিক দায়িত্ব স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা দরকার। তাদের মাধ্যমে যে কোনো বরাদ্দ কেবল ব্যাংকিং চ্যানেলে, প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব নম্বর ব্যবহারের মাধ্যমে এবং ডিজিটাল অডিট-ট্রেইল রেখে বিতরণ করতে হবে। নগদ অর্থ ব্যবস্থার অবসান না ঘটালে নির্বাচনি তহবিলের দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব হবে না।

নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটিকে কেবল অভিযোগ ফরোয়ার্ড করার একটি “ডাকবাক্স” না রেখে, মাঠপর্যায়ে অভিযোগ তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ, তাৎক্ষণিক সুপারিশ ও প্রশাসনিক সংশোধনী উদ্যোগের ক্ষমতা দিতে হবে। প্রার্থিতা বাতিল বা নির্বাচন স্থগিত করার মতো উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশন নিলেও, অভিযোগের প্রাথমিক ও মাঝারি স্তরের প্রতিকারের ক্ষমতা নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটির হাতে রাখতে হবে, যাতে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত প্রতিকার পাওয়া যায় এবং রাজনৈতিক প্রভাব কমে।

শুধু অভিযোগ সারাংশ করে নির্বাচন কমিশনকে পাঠানো নয়, নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটিকে-কে নিজস্ব তদন্ত-দল, সাক্ষী তলব, পরিদর্শন ও সরাসরি নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা দিতে হবে। শুধুই প্রার্থী বাতিল বা নির্বাচন স্থগিতের মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের হাতে থাকবে; কিন্তু মাঠপর্যায়ের ভীতি প্রদর্শন, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ, ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম ইত্যাদি বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিকারমূলক আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটিকে-এর হাতে থাকা উচিত।

জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের নির্বাচনি দায়িত্ব পালনের সময় নির্বাহি ও রাজনৈতিক চাপ থেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য একটি স্পষ্ট প্রোটেকশন ফ্রেমওয়ার্ক প্রয়োজন-যেখানে বলা থাকবে, তারা যদি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ অবস্থান নেন এবং সেই কারণে স্থানান্তর, বদলি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি হন, তা হলে উচ্চ আদালত ও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে দ্রুত প্রতিকার পাওয়া যাবে।

সব SRO ও TOR-কে একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল আর্কাইভে জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে, যাতে আগামী দিনে আর কেউ দাবি করতে না পারে যে, কোন ম্যাজিস্ট্রেট, কোন নির্বাচনে কী দায়িত্বে ছিলেন- তার প্রাথমিক নথিই পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমান বাস্তবতা যেখানে একাধিক নির্বাচনের TOR ও SRO অসম্পূর্ণ, হারিয়ে যাওয়া বা আংশিক তা প্রমাণ করে যে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচনি প্রশাসনকে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্বচ্ছ রাখা হয়েছে।

সাথে স্বাধীন অডিট বাধ্যতামূলক করে, প্রতিটি নির্বাচনের পরে সংক্ষিপ্ত অডিট রিপোর্ট জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে— কোন জেলায়, কোন ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে কত টাকা খরচ হয়েছে।

২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে ম্যাজিস্ট্রেটদের যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল, তার বিষয়ে আরও তদন্ত করা উচিত এবং ওই প্রশিক্ষণের জন্য যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন তাদের শনাক্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

(১১) গোয়েন্দা সংস্থার কাজে স্বচ্ছতা

ডিজিএফআই, এনএসআইসহ সকল গোয়েন্দা সংস্থার কাজে স্বচ্ছতা আনা জরুরি যাতে ভবিষ্যতে এসব সংস্থা রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত না হতে পারে।

ডিজিএফআই এবং এনএসআই এ নিয়োগ, পদোন্নতি এবং পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন প্রয়োজন।

বেসামরিক প্রশাসনে ডিজিএফআই এবং এনএসআই এর অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।

(১২) অন্যান্য

সময় স্বল্পতার কারণে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের স্বার্থে ভবিষ্যতে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অন্তর্ভুক্ত করে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলোর অনিয়মের বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত এবং দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

সংবাদ প্রেরক বিটিসি নিউজ এর বিশেষ (ঢাকা) প্রতিনিধি মো: ফারুক আহম্মেদ। #

এইরকম আরও খবর

সর্বশেষ খবর

ব্রেকিং নিউজ
সিলেট-চট্টগ্রাম ফ্রেন্ডশীপ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে চট্টগ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ অধিকার বঞ্চিত শিশু ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ সর্বশেষ তিন সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রতিবেদনে যেসব সুপারিশ করেছে কমিশন আর কখনও যেন ‘নির্বাচন ডাকাতি’ না হয় সেই ব্যবস্থা করতে হবে : প্রধান উপদেষ্টা খালেদা জিয়ার স্মরণে নাগরিক শোকসভা আগামী শুক্রবার সাগরে অভিযান: অস্ত্র-গুলিসহ ১৯ ডাকাত আটক, গুলিবিদ্ধ একজনের মৃত্যু দুই লাখ কোটি টাকার সংশোধিত এডিপি অনুমোদন বোয়ালমারীতে পিকআপে ট্রেনের ধাক্কায় ৩ শ্রমিক নিহত, আহত-১০ বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের জনগণের আলোকবর্তিকা : মিলন রাজশাহীতে গণভোটের প্রচারে বিভাগীয় মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত