বিটিসি আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দিমোনা ও আরাদ শহরে ইরানের ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইসরায়েল সরকারের স্বচ্ছতা ও সামরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দেশটির বিশিষ্ট শান্তিকর্মী ও রাজনীতিবিদ ইয়ারিভ ওপেনহাইমার।
রোববার (২২ মার্চ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি অভিযোগ করেন, ইরান ফুরিয়ে আসছে বলে সরকার যে দাবি করছে তা সঠিক নয় এবং সাধারণ মানুষের কাছে প্রকৃত তথ্য গোপন করা হচ্ছে।
ওপেনহাইমার প্রশ্ন তুলেছেন, ইরানের অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কেন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম হলো এবং তেহরানের কাছে আর কতটি ক্ষেপণাস্ত্র অবশিষ্ট আছে সে সম্পর্কে সরকার কেন স্পষ্ট উত্তর দিচ্ছে না। দিমোনা ও আরাদ শহরে ইরানের সাম্প্রতিক হামলায় শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার ঘটনায় ইসরায়েলি জনসাধারণের মধ্যে তৈরি হওয়া ক্ষোভের প্রতিফলন ঘটেছে ওপেনহাইমারের এই বক্তব্যে।
এদিকে চতুর্থ সপ্তাহে পা রাখা এই যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক বিমান চলাচল খাতে নজিরবিহীন ধস নেমেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ফেব্রুয়ারি মাসে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্বের শীর্ষ ২০টি বিমান সংস্থা প্রায় ৫৩ বিলিয়ন ডলারের বাজার মূল্য হারিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান বিমানবন্দরগুলো অচল হয়ে পড়া এবং জ্বালানি তেলের দাম দ্বিগুণ হওয়ার ফলে এই খাতটি করোনা মহামারীর পর সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে পড়েছে।
বিশেষ করে বিমানের জ্বালানি বা জেট ফুয়েলের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের টিকিটের দাম কয়েক গুণ বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সামরিক ও কূটনৈতিক ফ্রন্টেও উত্তজনা প্রশমনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
গ্লোবাল পলিসি ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট পাওলো ভন শিরাচ আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তেহরানের আকাশ নিয়ন্ত্রণ করলেও ইরানি নেতৃত্বকে নতি স্বীকারে বাধ্য করা এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়নি।
তার মতে, ইরানকে পরাজিত করতে হলে তাদের পক্ষ থেকে হার স্বীকারের ঘোষণা আসতে হবে, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রায় অসম্ভব।
অন্যদিকে, সাইপ্রাসে অবস্থিত ব্রিটিশ বিমান ঘাঁটি ‘আক্রোতিরি’ থেকে পরিচালিত অভিযানের জেরে লন্ডন ও নিকোসিয়ার মধ্যে কূটনৈতিক টানাপড়েন শুরু হয়েছে।
সাইপ্রাস সরকার তাদের দ্বীপে ব্রিটিশ ঘাঁটির উপস্থিতি পুনর্বিবেচনা করার হুমকি দেওয়ায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার উত্তেজনা প্রশমনে তৎপর হয়ে উঠেছেন।
ইরান যুদ্ধের আঁচ এখন সৌদি আরবের জ্বালানি কেন্দ্রগুলোতেও লাগতে শুরু করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ইরান থেকে সৌদি আরবের দিকে ছোড়া প্রায় ৬০টি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে রিয়াদ। এসব ড্রোন মূলত সৌদি আরবের পূর্ব প্রদেশ ও ইয়ানবু বন্দরের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাঠানো হয়েছিল।
যদিও সৌদি আরব লোহিত সাগর দিয়ে তেল রপ্তানির বিকল্প পথ ব্যবহারের সুবিধা পাচ্ছে, তবুও ক্রমাগত এই হামলা দেশটির অর্থনীতির জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত জ্বালানি খাতের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।
পাশাপাশি ইরাকের ইসলামি প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো গত একদিনে বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে ২১টি ড্রোন ও রকেট হামলা চালানোর দাবি করেছে, যা পুরো অঞ্চলকে এক বহুমুখী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
জাপানি নাগরিকদের মুক্তি ও ইইউ-এর গ্যাস সংকটের মতো খবরগুলোও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গুরুত্ব পাচ্ছে।
জাপানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিৎসু মোতেগি জানিয়েছেন, ইরানে গত বছর থেকে আটক থাকা দুই জাপানি নাগরিকের মধ্যে একজনকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
তবে যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) তাদের সদস্য দেশগুলোকে শীতকালীন গ্যাস মজুত করার তাগিদ দিয়েছে, কারণ কাতার ও ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলার ফলে বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম অত্যন্ত অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও কূটনীতির ভিত্তি নাড়িয়ে দিচ্ছে। #















