ঢাকা প্রতিনিধি: এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘কঠিন পরীক্ষা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, আমাদের এই পরীক্ষাটা খুব কঠিন পরীক্ষা। এই নির্বাচনে নির্ধারিত হবে, এই দেশ কি লিবারেল ডেমোক্রেটদের হাতে থাকবে নাকি আপনার সমস্ত উগ্রপন্থি রাষ্ট্রবিরোধী লোকজনের মধ্যে থাকবে? আমাদেরকে অবশ্যই সেই উদারপন্থি রাস্তা বেছে নিতে হবে, গণতন্ত্রের রাস্তা বেছে নিতে হবে, মানুষের কল্যাণের রাস্তা বেছে নিতে হবে।
আজ মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) দুপুরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় বিএনপি মহাসচিব এসব কথা বলেন। কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের হলে বিএনপির উদ্যোগে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এ আলোচনা সভা হয়। গতকাল সোমবার ছিল জিয়াউর রহমানের জন্মদিন। দিবস পালনে বিএনপি দুদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, নির্বাচন আসছে, দেখা যাক কে কতটা ভোট পায়। সেজন্য আমরা ভোটের জন্য উন্মুখ হয়ে আছি। আমরা নির্বাচন চাই। আমরা জনগণের কাছে যাব, জনগণ যদি আমাদেরকে গ্রহণ করে আমরা আছি। আর যদি বাদ দেয় আমরা বিরোধী দলে থাকব, তাই না? আগে থেকে এত গলাবাজি কেন ভাই?
মির্জা ফখরুল বলেন, সে কারণেই আমাদের ৩১ দফা। আমাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে আট দফা দিয়েছেন, আবার নতুন করে—ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মারস কার্ড এই বিষয়গুলো জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমাদেরকে নির্বাচনে ধানের শীষকে জয়যুক্ত করতে হবে। ধানের শীষকে যদি আমরা জয়যুক্ত করি, তাহলে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা জানানো হবে, আমাদের মাতা বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা জানানো হবে।
জামায়াতে ইসলামীর অতীত ভূমিকার সমালোচনা করে মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা মনে করি—রাজনীতি করছেন, রাজনীতি করেন সিধা রাস্তায় করেন। ধর্মকে ব্যবহার করে, মানুষকে বিভ্রান্ত করে, ভুল বুঝিয়ে নয়। দাঁড়ি পাল্লায় ভোট দিলে নাকি বেহেশতে যেতে পারবে, চিন্তা করেন! তাহলে আর নামাজ পড়া, আল্লাহর কাছে কমপ্লিট সারেন্ডার করা, ঈমান আনা—এগুলো দরকার নেই নাকি? আমাদের এখানে অনেক ওলামা আছেন তারা আবার বলতে পারবে।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, এরা এই মুনাফিকি করে মানুষকে ভুল বোঝায়। শুধু আজ না, পাকিস্তান যখন হয় ভারতবর্ষ যখন স্বাধীন হচ্ছে, যখন যে যার লড়াই করছে, মুসলমানদের আবাসের স্থল পাকিস্তানের জন্য, তখন তাদের নেতা মাওলানা মওদুদী পাকিস্তান আন্দোলন করেননি, বিরোধিতা করেছেন। আজকে বলতে বাধ্য হচ্ছি, এসব কথা। কারণ তারা এই কথাগুলো আজকে বিভিন্নভাবে মিথ্যা প্রচার করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছেন প্রতিটি মানুষ। তারা বিরোধিতা করেছে, ঠিক না? আজকে প্রতি মানুষ যখন ভোটের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে, বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের রাজনীতি, তারেক রহমানের নতুন রাজনীতি, আধুনিক রাজনীতি, যা বাংলাদেশকে পাল্টে দেবে তা গ্রহণ করবার জন্য মানুষ উন্মুখ হয়ে আছে, তখন তারা আবার সেটা বিভ্রান্তি সৃষ্ট করছে ধর্মের নামে।
মির্জা ফখরুল বলেন, আমাদের কথা খুব পরিষ্কার। আমরা ধর্মে বিশ্বাস করি। আমাদের নেতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, তিনি প্রথম কোরআন শরিফের কথা বলেছেন সংবিধানে। তিনি প্রথম সংবিধানের মধ্যে বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম সংযুক্ত করেছেন। তিনি প্রথম আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা-বিশ্বাসের কথা বলেছেন। আমরা সবসময় এভাবেই দেশের জন্য কাজ করেছি।
যারা নির্বাচন নিয়ে হুমকি-ধমকি দিয়েছে, তাদের প্রতি ইঙ্গিত করে মির্জা ফখরুল বলেন, অনেকে নির্বাচন হবে কিনা, নির্বাচন করতে দেব না—কত কী বলেছিল। ভেতরে ভেতরে খবর নিয়ে দেখেন, তাদের তিনটা ভোট নেই। তারা বড় গলায় বলে নির্বাচন হতে দেব না। নির্বাচন হোক, দেখা যাবে কে কত ভোট পায়।
প্রয়াত জিয়াউর রহমানের বর্ণাঢ্য জীবনের কথা উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, একজন অনন্য নেতা ছিলেন তিনি। তার নেতৃত্বে আলাদা একটা ভূখণ্ড তৈরি হয়েছে এবং স্বাধীন একটা ভূখণ্ড তিনি এই জাতিকে উপহার দিয়েছেন। গত কয়েকদিন আগে আমাদের আরেকজন নেত্রী তার সমস্ত জীবন দিয়ে আমাদের জন্য কাজ করে গেছেন, আমাদের গণতন্ত্রকে মুক্ত করেছেন, আমাদেরকে পথ দেখিয়েছেন, সেই নেত্রীকে আমরা হারিয়েছি। এই দেশের কোটি মানুষ সেদিন সমবেত হয়েছিল ওই পার্লামেন্ট চত্বরে। আমাদের নেত্রী যিনি গৃহবধূ ছিলেন, তিনি বাইরে বেরিয়ে এসে জিয়াউর রহমানের সেই পতাকা আবার ওপরে তুলে ধরেছেন। এরপর তাদেরই উত্তরসূরি তারেক রহমান, তিনি সেই পতাকা তুলে ধরেছেন।
ফ্যাসিবাদ-বিরোধী আন্দোলনের কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা যখন আন্দোলন করছিলাম, তখনই আমরা এই রাষ্ট্রীয় সংস্কারের রূপরেখা দিয়েছিলাম। প্রথমে ম্যাডাম দিয়েছিলেন ২০১৬ সালে ভিশন-২০৩০, এরপর আমাদের নেতা অন্যান্য দলের সঙ্গে বসে আলাপ করে ৩১ দফা দিয়েছেন।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ৩১ দফা কী ছিল, কী আছে? আজকে যে সংস্কারের কথা বারবার বলা হচ্ছে, সব পত্রিকা-রেডিও-টেলিভিশনেও খুব প্রচার হচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা থেকে শুরু করে সব উপদেষ্টা নেমে গেছেন প্রচারণায়, ভালো কথা। কিন্তু আমরা বলেছি—২০২২ সালেই আমরা এই সংস্কারের কথা বলেছি। আমরা যা যা বলেছি, সবগুলো আজ এখানে আছে। এই সংস্কার নিয়ে আমাদেরকে প্রশ্ন করে অনেকে, আপনারা সংস্কারের পক্ষে না বিপক্ষে? এটা তো আমারই সন্তান। আমি তো তার জন্য প্রাণ দিতে পারি। এই যে জিনিসগুলো সবসময় বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে। আমি সোজাসুজি বলি, এটা আমাদের ব্রেইন চাইল্ড। সংস্কার যেটুকু হয়েছে, যেখানে একমত হয়েছে, সব রাজনৈতিক দলগুলো অবশ্যই সেটাতে হ্যাঁ-তে আছি। যেগুলোতে আমরা একমত হইনি, সেগুলো ঢুকিয়ে দিয়েছে, তারপরেও আমরা মেনে নিয়েছি। ঠিক আছে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে, জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে, আমাদের কাছে যেটা গ্রহণযোগ্য নয়, সেটাও আমরা মেনে নিয়েছি। পরে পার্লামেন্টে রাখা যাবে।
মির্জা ফখরুল বলেন, আজকে পরিকল্পিতভাবে একটা প্রচারণা আছে। এর কারণ বিএনপি সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল। নির্বাচন হলে বিএনপির বিজয় হবে। হবে কি না? হবে। সেই কারণে বেশি দুষ্টামি কারা করছে, যারা অতীতে বাংলাদেশকে অস্বীকার করেছে, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা বেশি করে না এবং ওই সময় কত মানুষ মেরেছে। কতজনকে পাকিস্তান হানাদার বাহির হাতে আমাদের মা-বোনদের তুলে দিয়েছে, এই হিসাব আমরা ভুলিনি।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে ও সহদপ্তর সম্পাদক তারিকুল ইসলাম তেনজিংয়ের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর সরাফত আলী সপুসহ অন্যান্যরা।
সংবাদ প্রেরক বিটিসি নিউজ এর ঢাকা প্রতিনিধি মো. রাজু আহমেদ। #















