ইসলামপুর (জামালপুর) প্রতিনিধি: ফসলি জমির প্রাণ হিসেবে পরিচিত উপরিভাগের মাটি বা ‘টপ সয়েল’ কাটার মহোৎসব চলছে জামালপুরের ইসলামপুরে। আমন ধান ঘরে তোলার পরপরই শুরু হয়েছে এই মাটি লুটের যজ্ঞ।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের উর্বর কৃষিজমি থেকে দেদারসে মাটি কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে স্থানীয় ইটভাটাগুলোতে। ভাটার মালিকদের অর্থের লোভে কৃষকরা ফসলি টপ সয়েল কাটার ফলে আশঙ্কাজনক হারে কমছে আবাদি জমি, নষ্ট হচ্ছে মাটির উর্বরতা।
জানা গেছে, এই উপজেলায় ১০টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র একটিরও নেই। এরপরও এসব ভাটায় থেমে নেই ইট পোড়ানো। একটি ইট তৈরিতে প্রায় ৪ কেজি মাটির প্রয়োজন। প্রতিটি ইটভাটায় প্রতি বছর ১৫ থেকে ২০ লাখ ইট উৎপাদিত হয়। বছরের পর বছর কৃষকদের বোকা বানিয়ে ভাটার মালিকরা কৃষিজমির উপরি ভাগ লুটে নেন।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার সদর ইউনিয়নের পাঁচবাড়িয়া,পচাবহলা, পার্থশী ইউনিয়নের পশ্চিম ও পূর্ব মোজাআটা, রৌহের কান্দা,মুখশিমলা, ঢেংগারগড়, বানিয়াবাড়ি,জারুলতলা, চরগোয়ালিনী ইউপি’র ডিগ্রীর চর, আকন্দপাড়া, দরিয়াবাদ,চিনাডুলী ইউনিয়নের বলিয়াদহ,আমতলী,নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের উলিয়া,রামভদ্র,পৌর এলাকার সর্দার পাড়া,ফরিকর পাড়াসহ বিভিন্ন স্থানে চলছে ফসলি জমি থেকে মাটি কাটার মহোৎসব। প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অন্তত ২৫ থেকে ৩০টি স্থান থেকে খননযন্ত্র দিয়ে ফসলি জমির মাটি কেটে ট্রাক্টর মেশিনের সাহায্যে মাটি যাচ্ছে বিভিন্ন ভাটায়।
উপজেলার পাঁচবাড়িয়া গ্রামের আলাল শেখ নামে এক ইটভাটার শ্রমিক বলেন, জমির উপরের মাটি ছাড়া ইট তৈরি করা কোনোভাবেই সম্ভব না। ভাটার মালিকরা কৃষকদের কাছ থেকে মাটির উপরের অংশ কিনছেন এবং তা দিয়ে ইট তৈরি হচ্ছে।
বানিয়াবাড়ি গ্রামের কৃষক সহিজল হক বিটিসি নিউজকে বলেন, ‘মাটি বিক্রি করতে আগ্রহী ছিলাম না। পাশের জমি থেকে মাটি বিক্রি করায় আমার ফসলি জমি উঁচু হয়েছে। তাই বাধ্য হয়েই মাটি বিক্রি করে দিচ্ছি’।
উপজেলা কৃষি অফিসার আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল বিটিসি নিউজকে বলেন, ‘মাটির উপরিভাগ থেকে ৫-১০ ইঞ্চি স্তর পর্যন্ত হলো মাটির প্রাণ, একে টপ সয়েল বলা হয়। এতে জৈব পদার্থ ও অণুজীবের সর্বাধিক ঘনত্ব থাকে এবং মাটির এই অংশে ফসল উৎপাদিত হয়। মাটি খুঁড়ে বিক্রি করার ফলে তা পুনরায় ফিরে আসতে সময় লাগে ৪ থেকে ৫ বছর।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রশাসনের চোখের সামনেই ফসলি জমির মাটি কেটে ট্রাকে করে ভাটায় নেওয়া হচ্ছে, অথচ কর্তৃপক্ষ বলছেন অভিযান চলমান রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাটির উপরিভাগের ৮-১০ ইঞ্চি স্তর বা টপ সয়েলে ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় জৈব পদার্থ ও পুষ্টি উপাদান সবচেয়ে বেশি থাকে। কৃষি বিভাগের মতে, এই স্তর কেটে নিলে জমির উর্বরতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায় এবং তা পুনরায় ফিরে আসতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। টপ সয়েল সরে গেলে মাটির নিচের শক্ত ও পাথুরে স্তর বেরিয়ে আসে, যেখানে পানি ধারণক্ষমতা থাকে না বললেই চলে। এতে জমি ধীরে ধীরে অনাবাধি হয়ে মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। কৃষি প্রধান এই উপজেলায় আবাদি জমি কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কাও প্রবল হচ্ছে। ফসলি জমি রক্ষায় কেবল সচেতনতা নয়, প্রশাসনের কঠোর ও স্থায়ী পদক্ষেপও জরুরি বলে মনে করছে স্থানীয় সচেতন মহল।
সহকারী কমিশনার (ভূমি)রেজোয়ার ইফতেকার বিটিসি নিউজকে জানান, এ বিষয়ে আমাদের অভিযান অব্যহত রয়েছে। ইতিমধ্য একাধিক ইটভাটাতেও মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমান করা হয়েছে। মাটি ও বালু উত্তোলনের আরো তথ্য থাকলে ছবি তুলে আমাদের পাঠিয়ে দিন।
সংবাদ প্রেরক বিটিসি নিউজ এর ইসলামপুর (জামালপুর) প্রতিনিধি লিয়াকত হোসাইন লায়ন। #















