বিটিসি আন্তর্জাতিক ডেস্ক: জাতিসংঘকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত বিকল্প সংস্থা ‘বোর্ড অব পিস’ যাত্রার শুরুতেই ব্যাপক বিদ্রূপ, উপহাস ও কূটনৈতিক বিতর্কের মুখে পড়েছে।
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম–এ জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মাধ্যমে সংস্থাটির উদ্বোধন হলেও সদস্য রাষ্ট্র নির্বাচন ও ট্রাম্পের নিজস্ব অভিবাসন নীতির মধ্যে স্পষ্ট অসংগতি সামনে এসেছে।
উদ্বোধনী মঞ্চে ট্রাম্প যেসব দেশকে ‘বন্ধু’ হিসেবে স্বাগত জানান, তাদের প্রায় অর্ধেকই যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ‘ট্রাভেল ব্যান’ বা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে। এই তালিকায় থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, জর্ডান, কসোভো, মঙ্গোলিয়া, মরক্কো, পাকিস্তান ও উজবেকিস্তান।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব দেশের নাগরিকদের জন্য ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে অভিবাসী ভিসা কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রেখেছে। ফলে কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—যে দেশগুলোর নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তারাই কীভাবে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন একটি বৈশ্বিক শান্তি সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়?
ট্রাম্প এই বোর্ডকে ‘ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা’ হিসেবে আখ্যা দিলেও বাস্তবে এটি শুরুতেই বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে পড়েছে। ট্রাম্প নিজেই বোর্ডটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত দেশগুলোর মধ্যে ছিল আর্জেন্টিনা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহরাইন, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, কসোভো, মঙ্গোলিয়া, মরক্কো, পাকিস্তান, প্যারাগুয়ে, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও উজবেকিস্তান।
এই তালিকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো প্রভাবশালী রাষ্ট্রের উপস্থিতি ছিল না। একই সঙ্গে কূটনৈতিক সূত্রে আলোচনা রয়েছে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকেও এই বোর্ডে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
আরও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে বোর্ডের অর্থনৈতিক কাঠামো। সদস্য হতে প্রতিটি দেশকে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার অবদান রাখার শর্ত দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ব্রিটিশ সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার-কে বোর্ডের সদস্য হিসেবে ঘোষণা করায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনার মাত্রা আরও বেড়েছে। ট্রাম্প বলেন, “যখন আমেরিকা সমৃদ্ধ হয়, তখন পুরো বিশ্ব সমৃদ্ধ হয়।”

এদিকে সম্মেলনের আরেকটি আলোচিত অংশ ছিল ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের উপস্থাপিত তথাকথিত ‘নিউ গাজা’ পরিকল্পনা। সিজিআই প্রযুক্তিতে তৈরি নকশায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত গাজাকে একটি আধুনিক ‘রিভিয়েরা’ বা পর্যটন নগরীতে রূপান্তরের ধারণা তুলে ধরা হয়।
পরিকল্পনায় অত্যাধুনিক ডেটা সেন্টার, উঁচু লাক্সারি অ্যাপার্টমেন্ট, উপকূলীয় পর্যটন কেন্দ্র, এক লাখের বেশি আবাসন ইউনিট এবং ৭৫টি আধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্র নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেখানো হয়েছে।
ট্রাম্প দাবি করেন, ‘বোর্ড অব পিস’ গাজার সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত করবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একে ‘বোর্ড অব অ্যাকশন’ বা কর্মমুখী সংস্থা হিসেবে উল্লেখ করেন।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, কুশনারের উপস্থাপিত এই নকশা এর আগে প্রকাশিত একটি এআই–নির্মিত ভিডিওর সঙ্গে বিস্ময়করভাবে মিল রয়েছে, যেখানে ট্রাম্প ও ইলন মাস্ককে গাজা উপকূলে দেখা গিয়েছিল।
ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটেই ‘বোর্ড অব পিস’-এর ধারণা এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে। ট্রাম্পের দাবি, তাঁর এই উদ্যোগ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন পেয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘বোর্ড অব পিস’ মূলত জাতিসংঘের প্রভাব কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার একটি রাজনৈতিক কৌশল।
তবে নিজস্ব নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত এই বোর্ডের কার্যকারিতা যেমন প্রশ্নের মুখে, তেমনি ১ বিলিয়ন ডলারের ‘এন্ট্রি ফি’ এটিকে অনেকের চোখে ‘ধনকুবেরদের ক্লাব’ হিসেবেই চিহ্নিত করছে। #

















