বিটিসি আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ টমাহোক ক্রুজ মিসাইল ব্যবহারের ফলে মার্কিন নৌবাহিনীর অস্ত্রাগারে যে ভয়াবহ শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে এখন পেন্টাগনের ভেতরে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষক হ্যারি জে. কাজিয়ানিস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, অপারেশন এপিক ফিউরির কারণে আমেরিকার দূরপাল্লার নির্ভুল আঘাত হানার সক্ষমতা এমন এক পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা কয়েক বছর আগেও ভাবা অসম্ভব ছিল।
সরকারিভাবে সংখ্যাটি গোপন রাখা হলেও ধারণা করা হচ্ছে কয়েকশ ক্ষেপণাস্ত্র ইতিমধ্যে ব্যয় হয়ে গেছে। এই ঘাটতি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের খরচ নয়, বরং এটি মার্কিন প্রতিরক্ষা কৌশলের জন্য এক বিশাল ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন নৌবাহিনীর শক্তির অন্যতম মেরুদণ্ড হলো ওহাইও-ক্লাস গাইডেড মিসাইল সাবমেরিন, যার প্রতিটি ১৫৪টি পর্যন্ত টমাহক মিসাইল বহন করতে পারে। বর্তমানে এই সাবমেরিনগুলো এবং অন্যান্য যুদ্ধজাহাজ থেকে যেভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হয়েছে, তাতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা ছিল তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকরা এখন চিন্তিত, একটি যুদ্ধ চালাতে গিয়ে তারা হয়তো অন্য একটি বড় যুদ্ধের প্রস্তুতি হারিয়ে ফেলছেন। বিশেষ করে বেইজিং যখন তাইওয়ানকে নিজেদের মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত করার জন্য মরিয়া হয়ে আছে, তখন আমেরিকার এই শূন্যতা তাদের জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টমাহক মিসাইল কোনো সাধারণ অস্ত্র নয় যা চাইলেই খুব দ্রুত তৈরি করা সম্ভব। এটি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান আরটিএক্স বা রেথিয়ন যে গতিতে এই ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করে, তা উচ্চ-তীব্রতার যুদ্ধের চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত সামান্য।
একটি উৎপাদন বৃদ্ধির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। ফলে ইরানের রাডার সাইট বা বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সদর দপ্তরে আজ যে মিসাইলটি আঘাত হানছে, সেটি মূলত তাইওয়ান প্রণালীতে মোতায়েন করার কথা ছিল এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ যা এখন হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।
চীনা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আমেরিকার এই মিসাইল সংকটের বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বেইজিংয়ের সামরিক বিশ্লেষকরা জানেন যে আমেরিকার এই মারণাস্ত্রের ভাণ্ডার ফুরিয়ে এলে তাদের পক্ষে তাইওয়ানে বড় কোনো অভিযান ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে।
শি জিনপিং বারবার তার সেনাবাহিনীকে তাইওয়ান দখলের সক্ষমতা অর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন এবং এখন আমেরিকার এই কৌশলগত দুর্বলতা তাদের সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্ররোচিত করতে পারে।
চীনের এই ঠাণ্ডা মাথার গণিত এখন আমেরিকার জন্য এক দুঃস্বপ্নের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে কারণ সামনের কয়েক বছরের মধ্যে ওহাইও-ক্লাস সাবমেরিনগুলোর বেশ কয়েকটি অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে। এই সাবমেরিনগুলোর কোনো যোগ্য বিকল্প আপাতত মার্কিন নৌবাহিনীর হাতে নেই।
নতুন যে ভার্জিনিয়া-ক্লাস সাবমেরিনগুলো তৈরি হচ্ছে, সেগুলোর মিসাইল বহন ক্ষমতা ওহাইও-ক্লাসের তুলনায় অনেক কম। এর সাথে টাইকনডেরোগা-ক্লাস যুদ্ধজাহাজগুলোর অবসায়ন যুক্ত হয়ে আমেরিকার ক্ষেপণাস্ত্র সংখ্যায় কয়েক হাজারের বিশাল ঘাটতি তৈরি করতে যাচ্ছে।
জাহাজ নির্মাণের ধীরগতি এবং ব্যাকলগ এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে টমাহক মিসাইল হলো প্রথম ধাপের অস্ত্র যা প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে পথ পরিষ্কার করে দেয়। তাইওয়ানে চীনের শক্তিশালী এস-৪০০ বা এইচকিউ-৯ এর মতো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে এই মিসাইলের কোনো বিকল্প নেই।
যদি প্রাথমিক আঘাতেই পর্যাপ্ত মিসাইল ব্যবহার করা না যায়, তবে পরবর্তী বিমান হামলা বা সেনা অভিযান পরিচালনা করা মার্কিন বাহিনীর জন্য অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
পেন্টাগন এখন সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি যেখানে তাদের যুদ্ধের পরিকল্পনাগুলো খাতা-কলমে থাকলেও হাতে পর্যাপ্ত রসদ নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনকে এখন জরুরি ভিত্তিতে টমাহক উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বড় অঙ্কের তহবিল বরাদ্দ করতে হবে। শুধুমাত্র শান্তির সময়ের বাজেট দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
মার্কিন নৌবাহিনীকেও এখন তাদের সক্ষমতা নিয়ে সত্য কথা বলতে হবে এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মিত্রদের আশ্বস্ত করতে হবে। কারণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কেবল অস্ত্রের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না, এটি নির্ভর করে প্রতিপক্ষের উপলব্ধির ওপর। যদি বেইজিং মনে করে যে আমেরিকার ভাণ্ডার শূন্য, তবে তারা যেকোনো সময় বড় কোনো পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না। #















