রেমাল প্রভাবের সাথে খুলনার চিংড়ি চাষীদের জন্য নতুন অশনি সংকেত, আমদানীকৃত চিংড়ি খাদ্যের ওপর অতিরিক্ত ৫% ট্যাক্স

খুলনা ব্যুরো: এখনও ঘূর্ণিঝড় রেমালের তান্ডবের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি খুলনাঞ্চলের মৎস্যচাষীরা। কিন্তু এরই মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে চিংড়ি খাদ্য আমদানীর ওপর ধরা হয়েছে অতিরিক্ত ৫% ট্যাক্স। এর ফলে চিংড়ি খাদ্যের দাম বৃদ্ধির আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর এর ফলে আবারো দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চিংড়ি শিল্পে দেখা দিল অশনি সংকেত।
খুলনা জেলা মৎস্য অফিসের দেওয়া তথ্য মতে, ঘূর্ণিঝড় রেমালের আঘাতে খুলনার নয়টি উপজেলার মধ্যে উপকূলীয় এলাকার ছয়টি অর্থাৎ কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়া ও রূপসার ৩৮টি ইউনিয়নের মৎস্য সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপে ক্ষতির পরিমাণ বেশি।
ঝড়ের তান্ডবে জেলার উক্ত ছয়টি উপজেলার ৩৫৫ দশমিক ৩০ হেক্টর জমির তিন হাজার ৬০০টি পুকুর এবং ১০ হাজার ২২৩ দশমিক ৭৫ হেক্টর জমির নয় হাজার ১১৫টি ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেইসাথে এক হাজার ৫৯০ হেক্টর জমির এক হাজার ৩৫৬টি কাকড়া/কুচিয়া খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলেও উল্লেখ করা হয় মৎস্য দপ্তরের প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, রেমালের প্রভাবে জেলায় মোট আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২৪৫ কোটি ৯৫ লাখ ৫০ হাজার টাকার মৎস্য সম্পদ। যার মধ্যে ৬৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা মূল্যের তিন হাজার ৭৮ মেট্রিক টন সাদা মাছ, ১১৪ কোটি ৬৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা মূল্যের দু’হাজার ৫৬৪ মেট্রিক টন চিংড়ি, ২০ কোটি ৫৭ হাজার টাকা মূল্যের ৬৩৬ মেট্রিক টন পোনা, ১৮ কোটি ৬৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা মূল্যের ১০২ দশমিক ২০ মেট্রিক টন কাকড়া/কুচিয়া, নয় কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের ২৭০ মেট্রিক টন পিএল(পোনা), ২০ লাখ টাকা মূল্যের ২০টি নৌকা/ট্রলার/জলযান এবং ১৬ কোটি ১১ লাখ টাকার অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে।
এদিকে, ঘূর্ণিঝড় রেমালের ক্ষতির মধ্যেই আরও একটি দু:সংবাদ আসলো মৎস্যচাষী বিশেষ করে চিংড়ি চাষীদের জন্য। আর তা’ হচ্ছে চিংড়ি শিল্পের জন্য বিদেশ থেকে আমদানীকৃত খাদ্যের ওপর অতিরিক্ত ৫% ট্যাক্স ধরা।
এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন আমদানীকারক বিটিসি নিউজকে বলেন, দেশের বাইরে থেকে মান সম্মত চিংড়ি খাদ্য এনে চিংড়ি শিল্পকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছিল, কিন্তু একদিকে যেমন ডলারের মূল্যবৃদ্ধি তেমনি আবার ট্যাক্স বৃদ্ধির ফলে এর প্রভাব প্রান্তিক চাষীদের ওপর গিয়েই পড়বে। সুতরাং অতিরিক্ত ৫% ট্যাক্স বৃদ্ধির বিষয়টি পুন:বিবেচনায় আনা উচিত বলেও তিনি মনে করেন।
বটিয়াঘাটার চিংড়ি চাষী মিঠুন গাইন বলেন, বিগত কয়েক বছর ধরে এসপিএফ (রোগমুক্ত) পোনার নামে যেসব চিংড়ি পোনা চাষীদের মধ্যে সরবরাহ করা হচ্ছে তাতে দেখা যায় অনেক চাষীই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাছাড়া মার্চ মাস থেকে চিংড়ি মৌসুম শুরু হলেও এখনও পর্যন্ত অনেক চাষী মাছের পোনা পাননি। বিশেষ করে একটিমাত্র হ্যাচারীর কাছে অনেকটা জিম্মি হয়ে পড়তে হচ্ছে চাষীদের। এজন্য তিনি সরকারিভাবে চিংড়ি পোনা সরবরাহের দাবি জানান।
খুলনা ফারমার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এড. শেখ আলাউদ্দীন আল মাসুদ (লিটন) বিটিসি নিউজকে বলেন, চিংড়ি খাদ্যের ওপর অতিরিক্ত ৫% ট্যাক্স ধরার ফলে চিংড়ি চাষীদের একাধিক সংকট মোকাবেলা করতে হবে। প্রথমত: ডলারের মূল্যবৃদ্ধির ফলে যেমন খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে দ্বিতীয়ত অতিরিক্ত ৫% ট্যাক্স বৃদ্ধির ফলে আমদানীকৃত চিংড়ি খাদ্যের দাম কেজিপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়ে যাবে। যার প্রভাব পড়বে সাধারণ চাষীদের ওপর।
খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়দেব পাল বিটিসি নিউজকে বলেন, আমদানীকৃত চিংড়ি খাদ্যের ওপর অতিরিক্ত ৫% ট্যাক্স বৃদ্ধির ফলে প্রতি কেজি খাদ্যের মূল্য অন্তত: ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়ে যাবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে ব্যক্তি পর্যায়ে চাষীরা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সার্বিকভাবে মাছ উৎপাদনে তেমন একটা প্রভাব পড়বে না। কেননা, রেমালের কারণে পানি বৃদ্ধি পেয়ে এক ঘেরের মাছ হয়তো অন্য ঘেরে যেতে পারে। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে চাষীদের প্রনোদনা দেওয়া হলে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, বর্তমানে খুলনাঞ্চলের সাধারণ ঘেরে মিশ্র চাষের পাশাপাশি অনেকেই আধা নিবিড় পদ্ধতিতে বাগদা, গলদা ও ভেনামি চিংড়ি চাষ করছেন। আর সাধারণ ঘেরে খুব বেশি একটা আমদানীকৃত খাদ্যের ব্যবহার না হলেও আধা নিবিড় পদ্ধতিতে চাষকৃত ঘেরে দেশীয় বিভিন্ন কোম্পানীর ফিডের পাশাপাশি দেশের বাইরে থেকে আমাদানীকৃত খাদ্য ব্যবহার হচ্ছে। কিন্তু ট্যাক্স বৃদ্ধির ফলে চাষীদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে বলে তাদের ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার আশংকা রয়েছে।
সংবাদ প্রেরক বিটিসি নিউজ এর খুলনা ব্যুরো প্রধান এইচ এম আলাউদ্দিন এবং মাশরুর মুর্শেদ। #

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.