খুলনা ব্যুরো: তীব্র জনবল সংকট, অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং ন্যায্য মজুরি বঞ্চনার অভিযোগ তুলে দ্রুত নিয়োগ ও আউটসোর্সিং বন্ধের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে ওজোপাডিকো কর্মচারী ইউনিয়ন।
রবিবার (১২ এপ্রিল) খুলনা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের নেতারা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিদ্যুৎ সেবার মান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে এবং কর্মচারীদের জীবন-জীবিকাও হুমকির মুখে পড়বে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোঃ মজিবর রহমান বলেন, ওজোপাডিকোর অধীনে বর্তমানে ১৭ লাখ ২৮ হাজার ৩১৬ জন গ্রাহক রয়েছে।
এই বিশাল গ্রাহকসেবা পরিচালনায় ১০ হাজার ৭৮৬ কিলোমিটার বিতরণ লাইন ও ৯৭টি ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্র রয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে কর্মরত কর্মকর্তা মাত্র ৪৪০ জন এবং শ্রমিক-কর্মচারী ৯৬৪ জন। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১:২.১৯, যা আদর্শ অনুপাত ১:৪ থেকে ১:৮ এর তুলনায় অনেক কম।
নেতারা অভিযোগ করেন, এই সীমিত জনবল দিয়ে প্রতিজন কর্মচারীকে গড়ে ১,৭৯২ জন গ্রাহকের সেবা দিতে হচ্ছে, যা বাস্তবসম্মত নয়। এতে সেবার মান যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি কর্মচারীদের ওপর বাড়ছে অস্বাভাবিক কাজের চাপ।
বিশেষ করে সাব-স্টেশন অপারেটর (এসবিএ) পদের সংকটকে গুরুতর সমস্যা হিসেবে তুলে ধরা হয়। ৯৭টি উপকেন্দ্রের মধ্যে ৮৬টিতে অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী এসবিএ পদের সংখ্যা হওয়া উচিত ৩৪৪ জন। কিন্তু বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২২৫ জন, ফলে শূন্য রয়েছে ১১৯টি পদ। আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে আরও ২০ জন অবসরে গেলে সংকট আরও প্রকট হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পদ পূরণ না করায় কর্মরত এসবিএ কর্মচারীরা প্রতিদিন স্বাভাবিক সময়ের বাইরে অতিরিক্ত ৮ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। যেখানে দৈনিক প্রয়োজনীয় মোট কর্মঘণ্টা ২,৭৫২ ঘণ্টা, সেখানে বর্তমান জনবল দিয়ে পূরণ হচ্ছে মাত্র ১,৮০০ ঘণ্টা। ফলে প্রতিদিন অতিরিক্ত ৯৫২ ঘণ্টা কাজ করতে হচ্ছে, যা মাসিক হিসেবে দাঁড়ায় ২৮ হাজার ৫৬০ ঘণ্টা।
অভিযোগ করা হয়, এই অতিরিক্ত কাজের বিপরীতে যথাযথ মজুরি দেওয়া হচ্ছে না। প্রতি মাসে মাত্র ৯,২০০ ঘণ্টার বিল পরিশোধ করা হলেও বাকি ২১,৩৬০ ঘণ্টার কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। একই সঙ্গে কর্মচারীরা সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটিও ভোগ করতে পারছেন না, যার ফলে তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, ২০২৫ সালে ৭৫ জন এসবিএ, ৬২ জন সহায়ক ও ৪০ জন নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এমনকি মৌখিক পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণের পরও তা স্থগিত করা হয়েছে, যা নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে দাবি করেন নেতারা।
এ সময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য তুলে ধরে তারা বলেন, দীর্ঘ সময় কাজ করার ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। ২০১৬ সালে অতিরিক্ত কাজের কারণে স্ট্রোক ও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বিশ্বে ৭ লাখ ৪৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ভেজাপাড়িকোর কর্মচারীরাও একই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন বলে তারা উল্লেখ করেন।
নেতারা অভিযোগ করেন, স্থায়ী নিয়োগের পরিবর্তে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যা একটি কারিগরি প্রতিষ্ঠানের জন্য অকার্যকর এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ‘ডিসেন্ট ওয়ার্ক’ নীতির পরিপন্থী। তারা অবিলম্বে আউটসোর্সিং বন্ধ করে স্থায়ী জনবল নিয়োগের দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, সংগঠনের সভাপতি সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, সহ-সভাপতি কাজী আলী আহসান সানী ও মোঃ আব্দুল আলীম, সাধারণ সম্পাদক মোঃ মজিবর রহমান, যুগ্ম সম্পাদক খন্দকার আব্দুল আউয়াল ও মোঃ মোজাফ্ফর রহমান তুহিন, সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ জিয়াউল হক, দপ্তর সম্পাদক মোঃ মাহমুদুল হক মাহমুদ, অর্থ সম্পাদক মোঃ আলী হোসেন, প্রচার সম্পাদক মোঃ সালামসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
সংবাদ সম্মেলনের শেষে নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তারা আপাতত রাজপথে নামতে চান না। তবে শ্রমিকদের ওপর চাপ ও বঞ্চনা অব্যাহত থাকলে শিগগিরই কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। #















