লালমনিরহাট প্রতিনিধি: লালমনিরহাট সরকারি কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নাঈম রহমান। নিজে পড়াশোনা করছেন—এতেই তিনি থেমে থাকতে চাননি। তিস্তা ও ধরলা নদীবেষ্টিত দুর্গম চরের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষাবঞ্চিত জীবন তাকে দীর্ঘদিন ধরেই ভাবিয়ে তুলছিল।
বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তিনি কাছ থেকে দেখেছেন চরের শিশুদের শিক্ষাবঞ্চনার বাস্তবতা। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই চরের শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ২০২২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষা উদ্যোগ ‘লালমনি বিদ্যাপীঠ’।
নিজ উদ্যোগে এবং বন্ধুদের সহযোগিতায় নাঈম রহমান বর্তমানে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের তিস্তা নদীর ডাউকির চর ও গোবর্ধান চর এবং সদর উপজেলার মোগলহাট ইউনিয়নের ধরলা নদীর ফলিমারী চর ও কুলাঘাট ইউনিয়নের খাটামারী চরে চারটি শিক্ষা কেন্দ্র চালু করেছেন। তার সঙ্গে প্রায় ২০ জন তরুণ স্বেচ্ছাসেবী কাজ করছেন।
‘চরের শিশুরা মেধায় নয়, পিছিয়ে রয়েছে সুযোগে’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে পরিচালিত এ শিক্ষা কার্যক্রমে প্রতিটি চরে প্রায় ৫০ জন করে ঝরে পড়া ও বিদ্যালয়বিমুখ সুবিধাবঞ্চিত শিশুকে নিয়মিত পড়ানো হচ্ছে। তাদের বই, খাতা, কলম ও পোশাকসহ প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে।
শুরুতে নাঈম ও তার বন্ধুরা নিজেদের অর্থ সংগ্রহ করে কার্যক্রম চালালেও বর্তমানে সমাজের বিভিন্ন দাতা ব্যক্তি ও শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে।
চর এলাকায় প্রতিষ্ঠিত ‘লালমনি বিদ্যাপীঠ’-এ শুধু প্রাথমিক স্তরের পাঠদানই নয়, শিশুদের কারিগরি দক্ষতা ও প্রযুক্তি বিষয়ে প্রাথমিক ধারণাও দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বাল্যবিবাহ, কুসংস্কার, স্বাস্থ্যবিধি ও পুষ্টি বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা হচ্ছে।
চারটি চরে প্রায় ৮০০ পরিবারের মধ্যে নাঈম ও তার স্বেচ্ছাসেবী বন্ধুরা নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছেন। প্রতি মাসে অন্তত দুইবার নারীদের নিয়ে উঠান বৈঠক করা হয়। সেখানে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশু পুষ্টি বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
চরের অতিদরিদ্র পরিবারের নারীদের জন্য সেলাই ও হস্তশিল্প প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে, যাতে তারা বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারেন।
খাটামারী চরের শিশু জিম আক্তার জুঁই (১২) জানায়, সে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে বিদ্যালয় ছেড়ে দিয়েছিল। পরে চরে ‘লালমনি বিদ্যাপীঠ’ চালু হলে আবার পড়াশোনা শুরু করেছে।
“প্রতি সপ্তাহে তিন দিন পড়ানো হয়। ফসলের মাঠে বাবা-মায়ের সঙ্গে কাজ করি। আবার পড়াশোনার সুযোগ পেয়ে খুব ভালো লাগছে। আমাদের বই-খাতা, কলম আর পোশাকও দেওয়া হয়।
গোবর্ধান চরের ছকিনা আক্তার (১১) জানায়, সে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর বিদ্যালয় ছেড়ে দেয়। এখন আবার পড়াশোনা শুরু করেছে।
“সপ্তাহে তিন দিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ক্লাস হয়। মাঝে মাঝে আমাদের কম্পিউটার শেখানো হয়।
ফলিমারী চরের অভিভাবক মেহেরুন বেগম বলেন, তার এক ছেলে ও এক মেয়ে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে বিদ্যালয় ছেড়ে দিয়েছিল। তারা কৃষিকাজে সাহায্য করত। এখন ‘লালমনি বিদ্যাপীঠ’-এ ভর্তি হয়ে আবার পড়াশোনা শুরু করেছে।
“ওরা এখন সংসারের কাজের পাশাপাশি পড়াশোনা করছে। সব শিক্ষা উপকরণ পাচ্ছে। বিদ্যাপীঠের লোকজন আমাদের নানা বিষয়ে সচেতন করছে। অনেক নারী সেলাই ও হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। আমিও পরে প্রশিক্ষণ নেব,” বলেন তিনি।
ডাউকির চরের অভিভাবক আফাজ উদ্দিন বলেন, “কলেজের ছাত্ররা আমাদের সুবিধাবঞ্চিত সন্তানদের শিক্ষিত করছে, আমাদের সচেতন করছে। আমরা খুবই খুশি।”
নাঈমের বন্ধু ও স্বেচ্ছাসেবী মাইসা মার্জান বলেন, নাঈম প্রথমে উদ্যোগ নেন, পরে বন্ধুরা মিলে তাকে সহযোগিতা করছেন। “নাঈমের উদ্যোগ দুর্গম চরের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের আলোকিত করছে। আমরা নিজেরাই শিশুদের পড়াই এবং সাধ্যমতো অর্থ দিয়েও সহযোগিতা করি। ভালো লাগা থেকেই এ কাজ করছি।
নাঈম রহমান জানান, বর্তমানে চারটি চরে কার্যক্রম চললেও চলতি বছর আরও ১৬টি চরে শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে আর্থিক সংকট বড় বাধা।“চরের শিশুদের মেধা আছে, কিন্তু সুযোগ না পাওয়ায় তারা মেধা বিকাশ করতে পারে না। একটু সুযোগ পেলে তারা অবশ্যই ভালো কিছু করে দেখাতে পারবে।
নাঈম আরও বলেন, “চরে কাজ করতে গিয়ে শিশুদের দুরবস্থা দেখে তাদের শিক্ষার আলোয় আনার স্বপ্ন দেখি। সেই স্বপ্ন থেকেই পথচলা শুরু। বন্ধুদের সহযোগিতা আছে, এখন সমাজের অনেক দাতা ব্যক্তিও এগিয়ে আসছেন।
তিনি বলেন, “চরের শিশুদের শিক্ষিত করা গেলে তারা একদিন দেশের সম্পদে পরিণত হবে। ভবিষ্যতে কিছু শিশুর সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার পরিকল্পনাও আমাদের রয়েছে।”
সংবাদ প্রেরক বিটিসি নিউজ এর লালমনিরহাট প্রতিনিধি হাসানুজ্জামান হাসান। #















