বিটিসি আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুদ্ধের জেরে জ্বালানিসংকটে পুরো বিশ্ব। কিন্তু ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ থামার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যুদ্ধের দ্রুত অবসান চাইলেও ইরান চাইছে দীর্ঘায়িত করতে। সেই কৌশল নিয়েই এগুচ্ছে দেশটি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান তার আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ, বিশেষ করে ইসরায়েল এবং তার মিত্র যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়িয়ে রাখতে চায়। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা কেবল শত্রুর পরাজয়ের অপেক্ষায়। তারা বলেছে, যুদ্ধ কবে শেষ হবে সেই সিদ্ধান্ত নেবে ইরান।
গতকাল বুধবার মার্কিন ঘাঁটি এবং ইসরায়েলে তীব্র ও বড় ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সবচেয়ে বড় হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান। নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে তেহরান হামলা চালিয়েছে। দুবাই বিমানবন্দরের আশাপাশে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। বাহরাইনেও মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা হয়েছে। হরমুজে পণ্যবাহী জাহাজে হামলা হয়েছে। ইসরাইল গতকালও তেহরান এবং লেবাননে পালটা হামলা অব্যাহত রেখেছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা হামলার ৩৮তম ধাপ শুরু করেছে। কুয়েতের আদিরি হেলিকপটার ঘাঁটিতে দুইটি শক্তিশালী ও যুগপত্ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করা হয়েছে।
আইআরজিসি আরো জানিয়েছে, তারা বাহরাইনের মিনা সালমান বন্দরে অবস্থিত আমেরিকান ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, কুয়েতের দুই নৌঘাঁটি ‘মোহাম্মদ আল আহমদ’ ও ‘আলী আল সালেম’ এ অবস্থিত ক্যাম্প প্যাট্রিয়ট এবং মার্কিন সন্ত্রাসী সেনাদের আবাসন ও সরঞ্জাম রাখার গুদামগুলোতেও ভয়াবহভাবে হামলা হয়েছে।
তারা জানিয়েছে, আমরা কেবল শত্রুর সম্পূর্ণ পরাজয় শিকারের কথা ভাবছি। আমরা তখনই এই লড়াই শেষ করব যখন দেশ থেকে যুদ্ধের ছায়া অপসারিত হবে। ইরানের শীর্ষ যৌথ সামরিক কমান্ডের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাকারি হুমকি দিয়েছেন, ইরানে একটি ব্যাংক লক্ষ্যবস্তু হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় দেশটি ঐ অঞ্চলের ইসরায়েলি ও মার্কিন ব্যাংকগুলোকে টার্গেট করবে।
ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চায় কেন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথমত, ইরান তার আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ, বিশেষ করে ইসরায়েল এবং তার মিত্র যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়িয়ে রাখতে চায়। দ্বিতীয়ত, সরাসরি বড় যুদ্ধে না জড়িয়ে, ইরান তার মিত্রগোষ্ঠীকে ব্যবহার করে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজেদের সক্ষমতা বজায় রাখতে চায়।
তৃতীয়ত, ইসরায়েল ও তার সহযোগীদের ওপর চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে ফিলিস্তিনি ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করা। চতুর্থত, ইরানের প্রধান ধর্মীয় নেতার ওপর হামলার পর দেশটি এখন আগের চেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ বলে মনে করা হচ্ছে, যা যুদ্ধের দীর্ঘায়িত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। পঞ্চমত, ইরানের দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের সক্ষমতা রয়েছে, যা ইসরায়েলকে চাপে ফেলার একটি অন্যতম কারণ।
যেভাবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে পারে তেহরান
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছিলেন যে, তেহরান দুই দশক ধরে মার্কিন যুদ্ধ নিয়ে গবেষণা করে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে যা রাজধানীতে বোমা হামলা হলেও লড়াই চালিয়ে যেতে পারে।
ইরানের সামরিক বিশেষজ্ঞরা একটি নতুন মতবাদ গড়ে তুলেছেন। মতবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘বিকেন্দ্রীভূত মোজাইক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা’। মোজাইক ডিফেন্স সিস্টেমের সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি হলো স্থানীয় কমান্ডারদের পূর্ণ স্বাধীনতা। সাধারণত যুদ্ধে কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের নির্দেশের ওপর ভিত্তি করে আক্রমণ পরিচালিত হয়। কিন্তু নতুন এই ব্যবস্থায় যুদ্ধে যদি কোনো কারণে তেহরানের কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় কিংবা শীর্ষ নেতারা নিহত হন, তবু প্রতিরোধ এক মুহূর্তের জন্যও থামবে না।
প্রাদেশিক কমান্ডাররা তেহরানের নির্দেশের অপেক্ষা না করেই পরিস্থিতি অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে ড্রোন বা মিসাইল হামলা, সামুদ্রিক আক্রমণ কিংবা গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবেন।
মোজাইক আর্টের ছোট ছোট টুকরোর মতো প্রতিটি ইউনিট আলাদা কাজ করলেও তারা একত্রে শত্রুর বিরুদ্ধে একটি দুর্ভেদ্য প্রতিরোধ বলয় তৈরি করবে। এই কৌশলের মূল লক্ষ্য শত্রুকে সম্মুখ সমরে দ্রুত পরাজিত করা নয়; বরং ইরানের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল ও বিস্তীর্ণ মরুভূমিকে কাজে লাগিয়ে আগ্রাসী বাহিনীকে ফাঁদে ফেলা। গেরিলা স্টাইলে হামলা চালিয়ে শত্রুপক্ষকে ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত করাই এই দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য। এতে আগ্রাসী বাহিনীর জন্য যুদ্ধটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও হতাশাজনক হয়ে উঠবে।
মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনাকর এই পরিস্থিতিতে ইরানের এমন পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, তারা যে কোনো মূল্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলে হাই-টেক সামরিক শক্তির বিপরীতে ইরানের এই ‘ডিসেন্ট্রালাইজড’ কাঠামো এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সমর বিশেষজ্ঞরা। #















